ফিচার

আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি কঠিন পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার জন্য — আল-বালাদ

না! আমি শপথ করছি এই শহরের। এমন এক শহরের যার নাগরিক স্বয়ং তুমি। শপথ করছি জন্মদাতার এবং যা সে জন্ম দেয়। নিঃসন্দেহে আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি কঠিন পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার জন্য। সে কি মনে করে যে, তার উপরে কারও ক্ষমতা নেই? বলে কিনা, “অনেক টাকা উড়িয়ে দিলাম।” সে কি মনে করে যে, তাকে কেউ দেখছে না?
আমি কি তাকে দুটো চোখ বানিয়ে দেইনি? একটা জিভ, দুটো ঠোঁট? আমি কি তাকে ভালো-মন্দের পরিষ্কার দুটো পথ দেখিয়ে দেইনি? — আল-বালাদ

শপথ করছি জন্মদাতার এবং যা সে জন্ম দেয়

কুর‘আনে যখন আল্লাহ تعالى কোনো কিছুর শপথ নেন, তার মানে সেটা কোনো বিরাট ব্যাপার। মানুষ যেন তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করে। এই সুরাহ’য় আল্লাহ تعالىআমাদেরকে পৃথিবীতে যে প্রাণ জন্ম দেওয়ার পদ্ধতি রয়েছে, তা লক্ষ্য করতে বলছেন। আমরা কি চিন্তা করে দেখেছি, আজকে জন্ম দেওয়ার যে পদ্ধতি আল্লাহ تعالى দিয়েছেন, তার থেকে ভালো কোনো পদ্ধতি কিছু হতে পারে কিনা? যদি কোনো উদ্ভিদ বা প্রাণী তার জন্মদাতা ছাড়াই এমনিতেই জন্ম হতো, তাহলে কী অবস্থা হতো? প্রথম জন্মদাতাকে কে জন্ম দিয়েছিল?

আমরা জানি, মুরগি ডিম পারে, তারপর ডিম থেকে মুরগি হয়। কিন্তু সর্বপ্রথম মুরগি ডিম ছাড়াই কীভাবে জন্ম নিলো? যদি সে ডিম থেকে এসে থাকে, তাহলে সেই ডিম কে পেড়েছিল?

বিবর্তনের ধারনা অনুসারে এক প্রাণী বিবর্তিত হয়ে আরেক প্রাণী তৈরি হয়। তার মানে একসময় এমন একটা প্রাণী ছিল, যা ডিম পাড়ত না। কিন্তু তারপর তা বিবর্তিত হয়ে ডিম পাড়া শুরু করলো। কিন্তু ডিম পাড়ার জন্য যে জটিল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ লাগে, সেটা কীভাবে কোনো একটা প্রাণীর মধ্যে হঠাৎ করে তৈরি হলো? একটা প্রাণী আগে ডিম পাড়ত না, কিন্তু এক প্রজন্ম থেকে সেটা হঠাৎ করে ডিম পারা শুরু করলো —সেটা কীভাবে সম্ভব? আবার, কয়েক প্রজন্ম ধরে একটা প্রাণী তার ভেতরে ডিম পাড়ার অঙ্গ একটু একটু করে তৈরী করছিলো, এটাও তো বিবর্তনের বিরোধী। কারণ বিবর্তন জটিল অপ্রয়োজনীয় বা আংশিক অঙ্গ তৈরী করে না। —এভাবে প্রতিটি প্রাণীর প্রথম জন্মদাতা কীভাবে আসলো, তা নিয়ে কি আমরা চিন্তা করেছি? আল্লাহ تعالى যে জন্মদাতার শপথ করেছেন, তার পেছনে এক বিশাল রহস্য রয়েছে। এর সমাধান মানুষ হাজার বছর গবেষণা করেও পায়নি।

আবার ধরুন, পৃথিবীতে জন্মদাতার কোনো ধারনা ছিল না। পুকুর, নদী, নালা, খাল, বিল, মাটি থেকে এমনিতেই কিছুক্ষণ পর পর বিভিন্ন উদ্ভিদ এবং প্রাণী জন্ম হয়ে বেরিয়ে আসতে থাকে। তাহলে কী অবস্থা হতো আমরা কল্পনা করি।

প্রথমত, যদি উদ্ভিদ এবং প্রাণী বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণে নিজে থেকেই জন্ম নিতো, তাহলে সেগুলোর কারও মধ্যে কোনো মিল থাকতো না। কারণ রাসায়নিক পদার্থের একেক মিশ্রণ থেকে একে রকমের প্রাণ তৈরি হতো। একবার হয়ত একটা ডাল-পালা, পাতা সহ একটা গাছ তৈরি হতো। আরেকবার ডালের আগায় পাতার বদলে চোখ সহ আরেকটা গাছ তৈরি হতো। আরেকবার একটা প্রাণী তৈরি হতো যার এক পায়ে গাছের মূল, আরেক পায়ে অক্টোপাসের শুঁড়। আল্লাহ تعالى জন্মদাতার ব্যবস্থা করেছেন দেখেই এক ধরণের প্রাণ থেকে একই ধরণের আরও প্রাণ তৈরি হয়। না হলে ভয়াবহ অবস্থা হতো।

দ্বিতীয়ত, কিছু রাসায়নিক পদার্থ একসাথে মিশেই যদি প্রাণ তৈরি হয়ে যেত, তাহলে রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণ থেকে আসলে কখনই জটিল প্রাণ অর্থাৎ কোনো উদ্ভিদ বা প্রাণী হতো না। শুধুই ভাইরাস তৈরি হওয়া সম্ভব হতো, যা আসলে কোনো প্রাণ নয়। আজকে জন্মদাতার ধারনা আছে দেখেই ভাইরাসের থেকেও জটিল প্রাণ তৈরি হওয়া সম্ভব হয়েছে।

যে কোনো ধরনের জটিল প্রাণ তৈরির শর্ত হচ্ছে, তা তৈরি হতে হবে একটি নির্দিষ্ট ডিজাইন অনুসরণ করে। এই ডিজাইনকে জন্মদাতা তার সন্তানের মধ্যে কোনোভাবে দিয়ে দেবে। তারপর সেই ডিজাইন অনুসরণ করে হুবহু না হলেও, খুবই কাছাকাছি অনুরূপ একটি প্রাণ জন্ম নেবে। আর ডিজাইন হতে হবে নিখুঁত এবং একটি সম্পূর্ণ প্রাণী সুস্থ সবলভাবে তৈরী করার ডিজাইন। আল্লাহ تعالى এই ডিজাইন সংরক্ষণ করেন প্রতিটি কোষের ভেতরে ডিএনএ-র মধ্যে।

যেমন, মানুষের ডিএনএ-র মধ্যে আল্লাহ تعالى লিখে দিয়েছেন: কীভাবে মানুষের দেহকে বানাতে হবে। এগুলোর মধ্যে তিন শত কোটি নির্দেশ লেখা রয়েছে। এই নির্দেশগুলো বলে দেয় কীভাবে চোখ, হাত, পা, মাথা, দেহের ভেতরে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সবকিছু বানাতে হবে। কোনটার কী আকৃতি হবে, কী রঙের হবে, কী কাজ করবে। কোনটায় কী সমস্যা থাকবে। কোনটা কখন বিকল হয়ে যাবে। মানুষের শরীরের কয়েক লক্ষ কোটি কোষ কোথায় কোন জায়গায় বসবে, কীভাবে কাজ করবে, এই সবকিছু বলা থাকে ডিএনএ-তে।

এই তিন শত কোটি নির্দেশ বই আকারে ছাপালে ১৩০ খণ্ডের বই হয়, যা পড়তে মানুষের প্রায় ৯৫ বছর লাগবে। এই বিশাল নির্দেশমালা আল্লাহ تعالى সংরক্ষণ করছেন ক্রোমোজোম নামের এমন ক্ষুদ্র একটি ব্যবস্থায়, যা খালি চোখে দেখা তো যা-ই না, সাধারণ অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও দেখা যায় না, বিশেষ শক্তিশালী অণুবীক্ষণ যন্ত্র লাগে। আর এই ক্রোমোজোমগুলো, যা কিনা ১৩০ খণ্ডের বইয়ের সমান, হুবহু একইভাবে রাখা আছে দেহের প্রতিটি কোষে। আমাদের দেহে কয়েক লক্ষ কোটি কোষের প্রত্যেকটির মধ্যে ঠিক একইভাবে তিন শত কোটি নির্দেশ লেখা আছে।

তৃতীয়ত, জন্মদাতার ধারনা আছে দেখেই কোটি কোটি বছর ধরে প্রাণ টিকে আছে। কারণ যখন কোনো প্রাণীর এক প্রজন্ম আশেপাশের প্রতিকুল পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে টিকে থাকে, তখন তার ক্রোমোজোমের মধ্যে সেই পরিস্থিতির সাথে খাপখাইয়ে চলার জন্য কী কী পরিবর্তন দরকার হয়েছিল, তা সংরক্ষণ হয়ে যায়। এরপর যখন সেই ক্রোমোজোম থেকে সন্তান জন্ম নেয়, তখন তারা জন্ম নেয় সেই পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে চলার জন্য প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য নিয়েই। একে ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ বলা হয়, যাকে অনেকে বিবর্তন বলে ভুল করেন। এই প্রাকৃতিক নির্বাচন আছে দেখেই উদ্ভিদ এবং প্রাণীজগত হাজারো প্রতিকূলতার মধ্যেও বংশবৃদ্ধি করে টিকে আছে। যদি কোটি বছর আগের আম গাছের ক্রোমোজোম নিয়ে আজকেও আম গাছ জন্ম হতো, তাহলে তা আজকের পৃথিবীর প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে হেরে গিয়ে কয়েকদিন পরেই মরে যেত। আম গাছ বছরের পর বছর নিজে সংগ্রাম করে বেঁচে থেকে, তারপর তার বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতাকে ক্রোমোজোমের মাধ্যমে তার সন্তানদের মধ্যে দিয়ে দেয় দেখেই, তার সন্তান জন্ম নিয়েই সেই প্রতিকূলতার সাথে নিজেই সংগ্রাম করে টিকে থাকতে পারে।

মানুষ যদি সময় নিয়ে এই পদ্ধতিটির পেছনে কত বিস্ময়, কত রহস্য আছে তা ভেবে দেখে, তাহলে তারা আল্লাহর تعالى ক্ষমতা, সৃজনশীলতার অসাধারণ সব নিদর্শন খুঁজে পাবে। আল্লাহ تعالى কুর‘আনে মানুষকে বহুবার তাঁর সৃষ্টিজগৎ নিয়ে চিন্তা করতে বলেছেন। এগুলো বলার পেছনে উদ্দেশ্য রয়েছে। কারণ আল্লাহকে تعالى জানার জন্য আমাদের কাছে দুটো মাত্র উপায় রয়েছে। একটি হচ্ছে তাঁর দেওয়া বাণী। আরেকটি হচ্ছে আমাদের চোখের সামনে তাঁর এই বিশাল সৃষ্টিজগৎ। আল্লাহর تعالى সম্পর্কে একটি সুষম ধারনা পেতে হলে শুধু তাঁর বাণী পড়লেই হবে না, একইসাথে তাঁর সৃষ্টিজগৎ নিয়েও গবেষণা করতে হবে। নাহলে আমরা তাঁর সম্পর্কে একটি অসম্পূর্ণ, ভারসাম্যহীন ধারনা নিয়ে থাকবো। আমাদের ইসলাম বোঝা এবং মানা দুটোই ভারসাম্যহীন হয়ে যাবে।

ভারসাম্যহীন ইসলাম মানার ফলাফল হয় ভয়ংকর। প্রচুর ইসলাম নিয়ে পড়ার পরেও দেখা যায় আল্লাহর تعالى প্রতি শ্রদ্ধা তৈরি হয় না। নানা ধরনের সন্দেহ, প্রশ্ন মাঝে মধ্যেই ঈমানে ফাটল ধরিয়ে দেয়। কিছু মন মতো না হলে আল্লাহকে تعالى দোষ দিতে থাকে। “কেন আল্লাহ تعالى এরকম করলো? ওরকম কী হতে পারত না? আমার সাথেই এমন হলো কেন? অন্যের কেন এমন হয় না?” —এই সব প্রশ্ন জর্জরিত করে দেয়। আর সবচেয়ে ভয়ংকর অবস্থা হয় যখন ইসলাম নিয়ে পড়তে পড়তে একসময় ইসলামের প্রতি অনীহা চলে আসে। একবার সেই অবস্থায় চলে গেলে সেখান থেকে ফিরে আসা অনেক কঠিন।

নিঃসন্দেহে আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি কঠিন পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার জন্য

আমরা যদি মানুষের জন্ম নেওয়ার পদ্ধতি দেখি, তাহলে দেখবো, মানুষের জন্ম নেওয়ার মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় তার পরিশ্রম। জন্ম নেওয়ার সময় তাকে চারিদিক থেকে পিষে সরু একটা সুরঙ্গ দিয়ে চেপেচুপে বের করা হয়। এরপর সে এসে পড়ে এক ভয়ংকর পরিবেশে। এতদিন সে এয়ারকন্ডিশন্ড পানির মধ্যে আরামে ভেসে বেড়াচ্ছিল। স্বয়ংক্রিয়ভাবে শরীরে পুষ্টি চলে যাচ্ছিল। খাওয়ার কষ্ট করতে হচ্ছিল না। এখন শুরু হলো তার ক্ষুধার কষ্ট। চিৎকার দিয়ে মা খুঁজে বের করে খাওয়ার জন্য পরিশ্রম করতে হয়। খেতে গেলে গলায় আটকে যায়। দম বন্ধ হয়ে যায়। হেঁচকি উঠে। তারপর মল ত্যাগের যন্ত্রণা। কিছুক্ষণ পর পর কাপড় ভিজিয়ে প্রস্রাব। তারপর উপর আছে ঠাণ্ডা এবং গরমের কষ্ট। পৃথিবীর যত ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া মহানন্দে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তার ছোট শরীর থেকে যত পারে পুষ্টি নিয়ে যায়। বিছানায় পোকা কুট কুট করে কামড়ায়। কাপড়ের ঘষা লেগে চামড়া জ্বলে লাল হয়ে যায়। কয়েকদিন পর পর সর্দি লেগে নাক বন্ধ, জ্বর, মাথা ব্যাথা। —কষ্টের পর কষ্ট। এভাবে সে হাজারো সংগ্রাম করে একটু একটু করে বড় হয়। একদিন বসা শেখে। তারপর একদিন কোনোমতে দাঁড়াতে পারে। তারপর একটু একটু করে হাটা। দৌড়াতে গিয়ে পড়ে গিয়ে ব্যাথা পাওয়া। বহু বছর সংগ্রামের পর একদিন গিয়ে নিজের দেহের উপর নিয়ন্ত্রণ পায়।

এতো গেল জন্মের প্রথম কয়েক বছর। আসল সংগ্রাম এখনও বাকি। শিশুকাল, বাল্যকাল, কিশোর বয়স, তরুণ, প্রবীণ, বৃদ্ধ বয়সের সংগ্রাম আসছে সামনে। একজন মানুষের জীবনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সংগ্রামের পর সংগ্রাম। পৃথিবীতে সে আসে কত দুর্বল, অসহায় অবস্থায়। কয়েকদিনের জন্য কিছু শক্তি, সামর্থ্য পায়। তারপর আবার দুর্বল, অসহায় অবস্থায় ধুঁকে ধুঁকে জীবন পার করে একদিন মাটিতে গিয়ে কেঁচো, বিছা, ফাঙ্গাসের খাবারে পরিণত হয়। অথচ এই মানুষই কিনা—

সে কি মনে করে যে, তার উপরে কারও ক্ষমতা নেই? বলে কিনা, “অনেক টাকা উড়িয়ে দিলাম।” সে কি মনে করে যে, তাকে কেউ দেখছে না?

এই দুর্বল মানুষ, যার বেঁচে থাকার জন্য পরিশ্রমের কোনো বিরাম নেই, সেই মানুষই একটু নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেই মনে করা শুরু করে যে, তার কাজের জন্য কাউকে জবাব দিতে হবে না। তখন সে নিজের লোভ-লালসা মেটানোর জন্য অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি করে। নোংরা বিনোদনে নিজের চরিত্রকে কলুষিত করে ফেলে। যে কোনো মূল্যে সে যা চাই, তাই তাকে পেতে হবে।

এদেরকে যখন কোনো ভালো কাজে কিছু দান করতে বলা হয়, তখন সে বলে, “আরে ভাই, কয়েকদিন আগেই ৮০ লাখ টাকা দিয়ে একটা গাড়ি কিনলাম। এখন আমাকে কিছু দিতে বলবেন না। আপনারা পরে আসেন।” এই ধরনের মানুষ কি চিন্তা করে দেখে না যে, কীসব কাজে সে টাকা উড়াচ্ছে, তার সবই আল্লাহ تعالى দেখছেন?

“সে কি মনে করে যে, তাকে কেউ দেখছে না?”

—এই হচ্ছে মানুষের পাপের মূল কারণ। মানুষ মনে করে যে, সে যখন টেবিলের তলা দিয়ে ঘুষ নিচ্ছে, চুপচাপ ফোনে আলাপ করে প্রজেক্ট থেকে কোটি টাকা মেরে দিচ্ছে, গোপনে মিটিং করে গরিবের হক, দেশের সম্পদ বিদেশে নিজের ব্যাংক একাউন্টে পাচার করে দিচ্ছে —এগুলো কেউ দেখছে না। তার মনে ঠিকই পুলিশ, ডিজিএফআই, দুদকের ভয় আছে; কিন্তু আল্লাহর تعالى ভয় নেই।

“সে কি মনে করে যে, তাকে কেউ দেখছে না?”

—এটাই হচ্ছে তাকওয়ার অভাব। তাকওয়া মানেই হচ্ছে, আল্লাহ تعالى তাকে সবসময় দেখছেন এবং তাকে তার সব কাজের জন্য আল্লাহর تعالى কাছে জবাব দিতে হবে। এই তাকওয়া না থাকলে মানুষ আর মানুষ থাকে না। তখন সে পশুর থেকেও অধম হয়ে যায়। একারণেই কুর‘আনে তাকওয়ার প্রতি এত জোর দেওয়া হয়েছে। একজন মানুষের যতই জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রতিভা থাকুক না কেন, তাকওয়া না থাকলে সেগুলো নিজের এবং অন্যের ক্ষতি করতে কাজে লাগাতে খুব একটা বাঁধে না।

আমি কি তাকে দুটো চোখ বানিয়ে দেইনি? একটা জিভ, দুটো ঠোঁট?

আজকে যদি আমাদেরকে বলা হয়, এক কোটি টাকা দেওয়া হবে, চোখ দুটো বিক্রি করে দেন —আমরা কি রাজি হবো? যদি বলা হয়, এক কোটি টাকার বিনিময়ে আপনার জিভ এবং ঠোঁট দুটো দিয়ে দেন —কেউ কি আছে যে রাজি হবে?

আমরা আমাদের শরীরে কোটি কোটি টাকার সম্পদ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। এই অমূল্য সম্পদগুলো না চাইতেই আল্লাহ تعالى বিনামূল্যে দিয়েছেন। এগুলো অর্জন করার জন্য আমাদেরকে কিছুই করতে হয়নি। এই সম্পদগুলো কেনার জন্য আজকে পৃথিবীতে অনেক অসুস্থ, বিকলাঙ্গ মানুষ তাদের সব সম্পদ দিয়ে দিতে রাজি আছে। অথচ এগুলো আমরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পেয়েও এগুলোর কদর করি না, আল্লাহর تعالى প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখানো তো দূরের কথা।

আল্লাহর تعالى দেওয়া এই অঙ্গগুলো ব্যবহার করেই আমরা আমাদের যাবতীয় সম্পদ অর্জন করি। এগুলো না থাকলে আমাদের জীবনে কোনো অর্জনই থাকতো না। অথচ এগুলো ব্যবহার করে সম্পদ অর্জন করার পর হঠাৎ করে কীভাবে যেন সব সম্পদ ‘আমার’ হয়ে যায়। তারপর আর আল্লাহর تعالى পথে ‘আমার’ সম্পদ খরচ করতে চাই না। —এরচেয়ে বড় অকৃতজ্ঞতা আর কী হতে পারে?

আমি কি তাকে ভালো-মন্দের পরিষ্কার দুটো পথ দেখিয়ে দেইনি? এরপরও সে কঠিন পথে চলার চেষ্টা করেনি। জানো সে কঠিন পথ কী? তা হচ্ছে, দাসকে মুক্তি দেওয়া। অথবা, কঠিন অভাবের দিনে খাবার দান করা, নিকটাত্মীয় এতিমদের এবং দারিদ্রের আঘাতে নিষ্পেষিত অসহায় মানুষকে। তারপর এমন সব মানুষদের একজন হয়ে যাওয়া, যারা গভীর বিশ্বাস করেছে এবং একে অন্যকে ধৈর্য ধারণ করতে তাগাদা দেয় এবং একে অন্যকে দয়া-মমতার প্রতি তাগাদা দেয়। তারাই তো সৌভাগ্যবান দল।

কিন্তু এরপরেও যারা আমার বাণী অস্বীকার করেছে, তারা হতভাগার দল। এদেরকে চারিদিক থেকে আগুন ঘিরে ফেলবে। —আল-বালাদ

আমি কি তাকে ভালো-মন্দের পরিষ্কার দুটো পথ দেখিয়ে দেইনি?

সুধীবৃন্দরা প্রশ্ন করেন, “কেন মানুষকে ইচ্ছার স্বাধীনতা দিয়ে আবার তাদেরকে এত সব নিয়ম দেওয়া হলো? একদিকে স্রস্টা মানুষকে চিন্তাভাবনার স্বাধীনতা দেবে, নিজের ভালমন্দ বোঝার ক্ষমতা দেবে, আবার অন্যদিকে বলে দেবে যে, এটা করা যাবে না, ওটা খাওয়া যাবে না, এটা দেখা যাবে না, ওটা শোনা যাবে না। —স্বাধীনতা দিয়ে আবার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া—এটা কি স্ববিরোধী কাজ নয়? এরকম স্ববিরোধী কাজ একজন স্রস্টা কীভাবে করতে পারে?”

এই সব সুধীবৃন্দের যাবতীয় যুক্তিতর্ক, জ্ঞানগর্ভ আলোচনা, দার্শনিক চিন্তাভাবনা —এই সবের পেছনে একটাই কারণ লুকিয়ে আছে: এরা তাদের মাথার উপরে কোনো ক্ষমতা আছে তা মেনে নেবে না। এরা নিজের ইচ্ছেমত জীবন পার করতে চায়। যত ইচ্ছে ফুর্তি করতে চায়। সেই ফুর্তি করার মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, এমন কোনো কর্তৃপক্ষ তারা সহ্য করবে না। তাদের যাবতীয় ‘বুদ্ধিবৃত্তিক’ আলোচনা, গবেষণা, প্রকাশনার পেছনে ঘাঁটলে শেষ পর্যন্ত গিয়ে একটাই কারণ বের হয়— এরা প্রত্যেকে নিজের ইচ্ছেমত পৃথিবীকে পেতে চায়।

প্রথমত, আল্লাহ تعالى  মানুষকে মোটেও বাধ্য করেননি তার কথামত চলতে। তিনি تعالى যদি সত্যিই বাধ্য করতে চাইতেন, তাহলে তিনি মানুষকে চিন্তার স্বাধীনতাই দিতেন না। মানুষকে তিনি تعالى পৃথিবীতে ছেড়ে দিয়েছেন তাদের ইচ্ছেমত চলতে। কিন্তু ইচ্ছেমত চলতে গিয়ে তারা যেন একে অপরের উপর অন্যায় না করে, পৃথিবীর ক্ষতি না করে, সেজন্য মানুষকে ভালো-মন্দের পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। যারা ভালো পথে চলবে, তাদেরকে তিনি تعالى বিশাল পুরস্কার দেবেন। আর যারা চলবে না, তাদেরকে তিনি যথাযথ শাস্তি দেবেন।

তাঁর تعالى কোনোই দরকার ছিল না ভালো কাজ করলে মানুষকে পুরস্কার দেওয়ার। তিনি মানুষকে বাঁচিয়ে রাখছেন, খাওয়ার জন্য ফল, ফসল, মাছ-মুরগী দিয়েছেন, সেটাই যথেষ্ট হতে পারত। কিন্তু না। তিনি تعالى অত্যন্ত দয়ালু দেখেই ভালো কাজের জন্য পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থা রেখেছেন। সেই পুরস্কার এতই কল্পনাতীত যে, মানুষ যেদিন তার ভালো কাজের পুরস্কার নিজের চোখে দেখবে, সেদিন সে নিজেই লজ্জায় পড়ে যাবে। ভাববে, এত বড় পুরস্কার পাওয়ার মত কিছুই তো সে করেনি। —আল্লাহর تعالى উদারতা অসীম। তিনি تعالى পুরস্কার দেওয়ার সময় কোনো হিসেব করেন না।

আবার, তিনি মোটেও বাধ্য নন খারাপ কাজের জন্য মানুষকে শাস্তি দেওয়ার। মানুষ সব একে অন্যকে মেরে, কেটে শেষ করে ফেলুক। কী যায় আসে তাঁর? —কিন্তু না। তিনি মানুষের কষ্টে সমব্যাথি, পরম বিচারক। নির্যাতিত, নিপীড়িতের জন্য তিনি تعالى যথাযথ প্রতিশোধ নেবেন। এই প্রতিশোধ নেওয়ার সময় তিনি تعالى মোটেও বাড়াবাড়ি করবেন না। কেউ শাস্তি পেয়ে বলবে না যে, তাকে তার পাপের তুলনায় অনেক বেশি শাস্তি দেওয়া হয়েছে। সবাই মাথা নিচু করে স্বীকার করবে তার পাপ কত ভয়াবহ ছিল।

দ্বিতীয়ত, মানুষকে যদি ভালো-মন্দের পথ দেখানো না হতো, তাহলে মানুষ তার পশুবৃত্তির দাস হয়ে যেত। এর শত শত প্রমাণ আজকাল আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে। মানুষের ভেতরে যতই উদারতা, ভালবাসা, অন্যের জন্য নিজে ত্যাগ করার মানসিকতা থাকুক না কেন, এই সব কিছুকে পরাজিত করে ফেলতে পারে তার লোভ এবং কামনা।

যেই ছেলে বা মেয়ে সকালে একজন ভদ্র, নম্র, বাবা-মা’র অনুগত সন্তান, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, এলাকায় উন্নয়নমূলক কাজে অংশ নেয়; সেই ছেলে-মেয়েই রাত হলে দরজা বন্ধ করে মোবাইলে, কম্পিউটারে নিজের কামনা মেটাতে এমন সব কাজ করে, যা পশুরাও করে না। পশুরা অন্তত অন্যদের করা দেখে নিজেরা তৃপ্ত হয় না। কিন্তু এই ধরনের মানুষরা হয়। এরা সকালে থাকে আলোকিত মানুষ, রাতে হয়ে যায় অন্ধকার পিশাচ।

আবার, একজন সমাজসেবী, দানশীল মানুষ, যাকে সমাজের সবাই শ্রদ্ধা করে, আদর্শ হিসেবে মেনে চলে, তিনিই দেখা যায় বছর শেষে কর ফাঁকি দেন। পণ্য সংরক্ষণ করার জন্য বিষাক্ত ক্যামিক্যাল ব্যবহার করেন। মেয়াদ উত্তীর্ণ কাঁচামাল কম দামে কিনে চালিয়ে দেন। শ্রমিকদের নুন্যতম বেতন দিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করান। ব্যবসার সর্বোচ্চ লাভ নিশ্চিত করার জন্য এই ‘মহান’ মানুষই নিজের স্বার্থে দানব হয়ে ওঠেন।

এভাবে আমরা দেখতে পাই যে, মানুষ যদি আল্লাহ্‌র تعالى দেখানো পথে না চলে, তাহলে তার নিজের নির্ধারণ করা ভালো-মন্দের মধ্যে ভারসাম্য থাকে না। তার ভালো-মন্দের সিদ্ধান্তগুলো অনেকাংশেই তার প্রবৃত্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়।  একদিকে তাকে দেখে ভালো মানুষ মনে হয়, কিন্তু অন্যদিকে সাধারণ মানুষের অগোচরে তার পাপের অন্ধকার রাজ্য চলতে থাকে।

এরপরও সে কঠিন পথে চলার চেষ্টা করেনি

ভালো পথে চলাটা মোটেও সহজ নয়, কারণ সেটা মানুষের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যায়। মানুষের প্রবৃত্তি হচ্ছে নিজের চাহিদা, কামনা, বাসনা মেটানোর জন্য সবরকম চেষ্টা করা। আমার অমুক ফোন চাই। আমার অমুক ব্র্যান্ডের গাড়ি চাই। আমার অমুক ডিজাইনের কাপড় চাই। আমি অমুক জায়গায় বেড়াতে যেতে চাই। আমি অমুক রেস্টুরেন্টে খেতে চাই। সবসময় শুধু ‘আমি, আমার, আমাকে’। এগুলোর বিরুদ্ধে গিয়ে নিজে থেকে আত্মত্যাগ করা, নিয়মের অধীনে থেকে সংযম করাটা কখনই মানুষের জন্য সহজ কাজ নয়। এর জন্য এক কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়।

যেমন ধরুন, আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, কাজের পাশাপাশি একটা ইসলামিক ডিগ্রির জন্য পড়াশুনা করবেন, বা এলাকার মুসলিম ভাইবোনদের সাথে নিয়মিত ইসলামি আলোচনায় অংশ নেবেন, অথবা কোনো স্বেচ্ছাসেবক সংগঠনে কাজ করবেন। আপনার পরিবারের সদস্যরা এই কথা শোনার পর আপনার উপর শুরু হবে তাদের যাবতীয় দাবি এবং অভিযোগের বৃষ্টি। এমনিতেই কাজের বাইরে আপনাকে কম পাওয়া যায়, এখন কেন আরও কম পাওয়া যাবে? যেই কাজ করতে আপনি বাধ্য নন, কেন আপনি সেই কাজের পিছনে এত সময় দেবেন? এগুলো না করে শুধু নামাজ-রোজা করলে ক্ষতি কী হবে? আমরা কী মুসলিম না? এগুলো না করলে কী জান্নাতে যাওয়া যায় না?

—এরকম হাজারো প্রতিকূলতার মধ্যে আপনি কোনোমতে সবাইকে দিনের পর দিন ম্যানেজ করে, নিয়মিত তাদের কটু কথা শুনে হয়তো সপ্তাহে একদিন, দু’দিন করে ইসলামের জন্য পড়াশুনা করবেন। কোনো ইসলামি আলোচনা, সেচ্ছাসেবী কাজে মাসে এক-দুইবার অংশ নেবেন। কিন্তু আপনার এই কাজে সাহায্য করার জন্য কেউ টিভি দেখা কমিয়ে দেবে না। ফোনে গল্প করা বন্ধ করবে না। আপনার পড়ার সময় বাচ্চাগুলোকে অন্য ঘরে নিয়ে যাবে না।

আপনার পরীক্ষাই চলুক, কোনো জরুরি প্রোগ্রামই থাকুক, বা রংপুরে কম্বল বিতরণের দায়িত্বই থাকুক না কেন, বাসায় কোনো মুরব্বি আত্মীয় আসলে, শ্বশুর-শাশুড়ি আসলে, বাচ্চাদের পরীক্ষা চললে কেউ আপনাকে একটুও ছাড় দেবে না। আপনাকে তখন সব বাদ দিয়ে সামাজিকতা করতে হবে। বরং যখন আপনার পড়াশুনার বেশি চাপ যাবে, বা ইসলামি কাজে একটু বেশি সময় দিতে হবে, তখনি আপনার কাছের জনের মাথা বেশি গরম হয়ে যাবে। নিয়মিত ঝগড়া শুরু হবে। আত্মীয়স্বজন নিয়মিত আপনাকে ফোন করে আবার ‘সাধারণ মুসলিম’ হয়ে যাওয়ার জন্য বার বার আপনাকে বোঝাবে। কবে কোন মুসলিমকে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়েছিল, জেলে নিয়ে কীভাবে পায়ের নখ তুলে নির্যাতন করেছিল, কোন ইসলামি দল কবে কোন নিরীহ মুসলিমকে ঘোল খাইয়েছিল —এই সব বলে আপনাকে নিয়মিত ভয় দেখাবে।

কষ্ট না করলে জীবনে কোনো ভালো কিছু পাওয়া যায় না। জান্নাতের বিরাট পুরস্কার তো আর আল্লাহ تعالى এমনিতেই দিয়ে দেবেন না। এর জন্য কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে। আল্লাহ تعالى আমাদেরকে দেখিয়ে দিয়েছেন এই কঠিন পথ কোনটা—

১) দাসকে মুক্তি দেওয়া

আমরা হয়ত ভাবতে পারি যে, আজকেতো আর দাস প্রথা নেই। তাই এই কাজ করার সুযোগ আমাদের আর নেই? হাজার বছর আগের দাসপ্রথা আজকে না থাকলেও, তারচেয়েও ব্যাপক আকারে আধুনিক-দাস ব্যবসা চলছে। এই ব্যবসায় অভাবী মানুষদের ভিসা দিয়ে বিদেশে নিয়ে গিয়ে পাসপোর্ট আটকে রেখে, তাদেরকে দিয়ে অমানুষিক পরিশ্রম করানো হয়। নামমাত্র বেতনের একটা বড় অংশ বিভিন্ন ফী, কমিশন দেখিয়ে দালালরা হাতিয়ে নেয়। অল্প যা থাকে, সেটা দেশে পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দিতে হয়। তারপর নিজে কোনোমতে দুই বেলা খেয়ে, সারাদিন অমানুষিক পরিশ্রম করে, রাতের বেলা খাচার মত গুমোট ঘরে অনেকজন গাদাগাদি করে ঘুমিয়ে থাকে। পরদিন থেকে আবার পশুর মত খাটনি। —এই হচ্ছে আধুনিক দাস প্রথা।

এভাবে শ্রমিক দাসদের জিম্মি করে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, চায়না, মধ্যপ্রাচ্য, আরব এবং আফ্রিকার দেশগুলোতে ব্যাপক উন্নয়ন চলছে। কন্সট্রাকশন কোম্পানিগুলো নামমাত্র খরচে শ্রমিক পেয়ে বিরাট লাভ করে ফুলে ফেপে যাচ্ছে। বিশাল সব দালানকোঠা, রাস্তাঘাট, পার্ক, বিনোদনের হাজারো ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে। তারপর সেসব জায়গায় গিয়ে আমরা পরিবার নিয়ে ফুর্তি করে আসছি। অঢেল টাকা উড়িয়ে আসছি। অথচ এই সব জাকজমকের পেছনে লুকিয়ে আছে লক্ষ শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের কান্না।

আজকে পৃথিবীতে ৪ কোটির উপরে দাস রয়েছে, যাদের কান্না, আহাজারি আমরা শুনতে পাই না। এদের মধ্যে ১ কোটি শিশু, প্রায় ২.৫ কোটি শ্রমিক, ১.৬ কোটি জোর করে বিয়ে করতে ধরে আনা অল্প বয়স্ক নারী এবং প্রায় অর্ধ কোটি নানা ধরনের বিকৃত যৌন কাজে আটকে রাখা নারী এবং শিশু।[৪০৮] এই সব দাসদের জীবন পশুর থেকেও অধম। এদেরকে নিয়মিত শারিরিক এবং মানসিক নির্যাতন করা হয়। শিক্ষা, চিকিৎসা দেওয়া হয় না। বন্দী পশুর মত স্বাধীনতার আশায় ছটফট করতে করতে এরা জীবন পার করে দেয়। এরা বেশি ঝামেলা করলে অত্যাচার করে হত্যা করে ফেলা হয়। —এই আধুনিক দাসেরা আজকের আধুনিক যুগের এক ভয়ংকর কালো অধ্যায়। আজকে মানুষ শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তিতে অনেক উন্নত হলেও, মানুষের পাশবিকতা কোনোভাবে কমে যায়নি।

আল্লাহ تعالى আমাদেরকে দাসদের মুক্ত করতে বলেছেন। এইসব আধুনিক দাসদেরকে মুক্ত করার জন্য আমাদেরকে কাজ করতে হবে। কাজটা মোটেও সহজ না। আল্লাহ تعالى আমাদেরকে বলছেনও না যে, কোনো সহজ দায়িত্ব দিয়েছেন তিনি। পরিস্কারভাবেই জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি আমাদেরকে দুটো চোখ, জ্বিভ, ঠোট, বুদ্ধিমত্তা, ভালো-মন্দ পথের সন্ধান দিয়েছেন। এগুলোর বিনিময়ে আমাদেরকে আত্মত্যাগ করতে হবে। অসহায় মানুষের পাশে দাড়াতে হবে। আমরা নিজেরা যদি স্বাধীনতা উপভোগ করি, তাহলে যেই সব দুস্থ মানুষরা পরাধীন অসহায় জীবন পার করছে, তাদেরকে স্বাধীন করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে।

২) কঠিন অভাবের দিনে খাবার দান করা, নিকটাত্মীয় এতিমদের

ইসলামে এতিম শুধু বাবা-মা হারা ছোট বাচ্চারাই নয়, এমনকি যারা বয়স্ক, যাদের কেউ নেই, যাদের অবস্থার উন্নতি করার কোনো সুযোগ তাদের নেই, তারাও এতিম।[১][১৭১]

সমাজে যত মানুষ রয়েছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যাদের দেখাশোনা করা দরকার, একটু আদর, একটু ভালবাসা দরকার, তারা হলো এতিম বাচ্চারা। একজন বাচ্চার কাছে তার বাবা-মার থেকে বেশি জরুরি আর কে হতে পারে? ছোট বাচ্চারা অসহায়, দুর্বল। তারা নিস্পাপ, তারা অবুঝ। আজকের নিষ্ঠুর সমাজে বাবা-মা ছাড়া একটি শিশুর একা একা জীবন কী ভয়ংকর কঠিন, এটা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। সমাজের অন্য যে কারো থেকে তাদের সাহায্য দরকার সবচেয়ে বেশি। আমরা যদি তাদের সাহায্যে এগিয়ে না আসি, তাহলে তারা কোথায় যাবে?

আমরা কয়জন জানি আমাদের এলাকায় এতিম কারা? আমরা প্রতিদিন মসজিদে নামাজ পড়তে ঢুকি এবং নামাজ শেষে বের হয়ে যে যার কাজে চলে যাই। নামাজের সময় পাশে বসা ছেড়া কাপড় পড়া মলিন মুখের অসহায় দেখতে মানুষটার খবর নেওয়ার প্রয়োজন পর্যন্ত অনুভব করি না। এতিমদের সাথে ইহসান করতে হলে প্রথমে আমাদেরকে তো আগে জানতে হবে আমাদের এলাকায় এতিম কারা!

আমাদেরকে মসজিদ দেওয়া হয়েছে যেন আমরা এলাকার মুসলিম ভাইদের খোঁজ খবর রাখি, একে অন্যের সাথে পরিচিত হই, বিপদে আপদে এগিয়ে যেতে পারি। কিন্তু আজকে মসজিদ শুধুমাত্র একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করার জায়গায় পরিণত হয়েছে। কোনোমতে নামাজ শেষ করে ডানে বামে না তাকিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বের হয়ে যেতে পারলেই বাঁচি।[১]

আল্লাহ تعالى এই আয়াতে আমাদেরকে বড় স্ট্যান্ডার্ড দিয়েছেন। আমাদেরকে অভাবের দিনেও খাবার দান করতে হবে। যখন আমি নিজেই অভাবে আছি, নিজের খাবারের সংস্থান নিয়ে সংগ্রাম করছি, সেই অবস্থায় অন্য অভাবীদের খাবার দিতে হবে। আজকাল আমরা সচ্ছ্বল অবস্থায় গেলে এক্তু আক্তু দান করা শুরু করি। নিজে এত ভালো আছি, ভালো-ভালো খাচ্ছি, দামি কাপড় পড়ছি, সুন্দর সব জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছি—নিজের কাছেই তখন খারাপ লাগা শুরু হয় যে, আমার আশেপাশে মানুষ কত কষ্টে আছে। তখন বিবেকের দংশনে দান করা শুরু করি। কিন্তু যখনি এক্তু সমস্যায় পড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্সে শুন্য একটা কমে যায়, তখনি সব দান বন্ধ করে হাতপা গুটিয়ে ফেলি।

এই আয়াতে আল্লাহ تعالى আমাদের কাছ থেকে আশা করেন যে, আমরা কঠিন অভাবের সময়ও অনাহারী মানুষদের খাবার দেবো। শুধুই সচ্ছ্বলতার সময় নয়।

৩) দারিদ্রের আঘাতে নিষ্পেষিত অসহায় মানুষকে

মিসকিন ٱلْمَسَٰكِين হচ্ছে খুবই গরিব মানুষরা, যাদের জন্য খাদ্য, বাসস্থান, কাপড় যোগাড় করা খুবই কঠিন। এরা সবসময় অভাবী। একজন এতিমের হয়ত উত্তরাধিকার সুত্রে সম্পত্তি থাকতে পারে। কিন্তু এদের কোনো সম্পত্তি থাকা তো দুরের কথা, মৌলিক চাহিদা পূরণ করার মতো সামান্য অবস্থাও নেই। এরা হচ্ছে সমাজের ভুলে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়া ধুলোয় ধূসরিত মানুষেরা।

আজকে আপনার-আমার পরিবার নিয়ে থাকার জন্য বাসা আছে। রাতে খাওয়ার মতো খাবার ফ্রিজে রাখা আছে। কালকে বাইরে পড়ার মতো কাপড় আছে। কিন্তু মিসকিনদের এসব কিছুই নেই। তারা প্রতিটা দিন কষ্টে, ভয়ে থাকে: কীভাবে তারা আগামীকাল কিছু খাবার, পড়ার মতো পরিষ্কার কাপড়, থাকার মতো জায়গা জোগাড় করবে। বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করা ছাড়া আর কিছু নিয়ে চিন্তা করার মতো অবস্থা তাদের নেই।[১][১১]

আজকে এমন কোনো অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নেই, যা বাধ্যতামূলকভাবে দেশের সকল মিসকিনদের অভাব দূর করে তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে বাধ্য। একমাত্র একটি ইসলামিক রাষ্ট্রের পক্ষেই সম্ভব সরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নিয়ে, জনগণের কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে যাকাত সংগ্রহ করে, একটি তহবিল গঠন করে, দেশের সকল মিসকিনদের অভাব দূর করার ব্যবস্থা করা।

যতদিন ইসলামিক আইন প্রতিষ্ঠা না হচ্ছে, ক্যাপিটালিস্ট অর্থনীতি ধনীদেরকে আরও ধনী বানিয়ে যাবে, এবং গরিবদেরকে আরও গরিব বানাতে থাকবে। আজকে পৃথিবীতে এমন কোনো ব্যবস্থা নেই, যা সম্পত্তিকে সুষমভাবে বণ্টন করে ধনী-গরিবের মধ্যে যে বিরাট পার্থক্য, তা দূর করতে পারে। যার ফলে সবসময় এমন কিছু মানুষ থেকে যায়, যারা তাদের প্রয়োজনের চেয়ে হাজার গুণ বেশি সম্পত্তি নিয়ে থাকে, যা তারা আমোদ ফুর্তিতে নষ্ট করে। অন্যদিকে এমন কিছু মানুষ সবসময় থেকে যায়, যারা দুই বেলা খাবারও জোগাড় করতে পারে না। সম্পদ সুষমভাবে বণ্টনের এমন কোনো পদ্ধতি কোনো সরকার যদি তৈরি করার চেষ্টাও করে, তখন দেশের বড় বড় ধনকুবেররা ব্যবস্থা করে দিবে যেন সেই সরকার বেশিদিন টিকে থাকতে না পারে।

আল্লাহর تعالى বিরুদ্ধে মানুষের একটি সাধারণ অভিযোগ হলো: আল্লাহ تعالى কেন পৃথিবীতে এত মানুষ পাঠাল, কিন্তু তাদের জন্য যথেষ্ট খাবার, প্রাকৃতিক সম্পদ, থাকার জায়গা দিয়ে পাঠাল না। এটি একটি বিরাট ভুল ধারণা যে, পৃথিবীতে এত যে গরিব মানুষ, তার মূল কারণ পৃথিবীতে সম্পদের অভাব। পৃথিবীত মাত্র ১% মানুষ পুরো পৃথিবীর ৪৮% সম্পদ দখল করে রেখেছে।[১৭৩] মোট জনসংখ্যার অর্ধেক, যা কিনা প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন মানুষ, আজকে পৃথিবীর মোট সম্পদের মাত্র ১% এর উপর বেঁচে আছে!

শুধু তাই না, মাত্র ২% সবচেয়ে ধনী মানুষগুলো পুরো পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি বাড়ি এবং জমির মালিক। বাকি অর্ধেক জমি এবং বাড়ির মধ্যে বাকি ৯৮% জনসংখ্যা বসবাস করছে। মানুষের মধ্যে আজকে যে এই চরম বৈষম্য, তার প্রধান কারণ মানুষের সীমাহীন লোভ, দুর্নীতি এবং ক্যাপিটালিস্ট অর্থনীতি। সুদ একটি বড় কারণ যা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে করে বড় লোকরা বসে বসে আরও বড় লোক হয়, আর মধ্যবিত্ত এবং গরিবরা অমানুষিক খাটার পরেও দিনে দিনে আরও গরিব হতে থাকে।

পুরো পৃথিবীর সব মানুষকে, পুরো ৬ বিলিয়ন মানুষের প্রত্যেককে, একটি বাসা এবং সামনে একটি ছোট বাগান দিলেও পৃথিবীর সব মানুষকে যুক্তরাষ্ট্রের এক টেক্সাস অঙ্গরাজ্যেই জায়গা দেওয়া যাবে। আল্লাহ تعالى আমাদেরকে এক বিরাট পৃথিবী দিয়েছেন, কিন্তু মাত্র ২% লোভী মানুষের কারণে আজকে ১.৬ বিলিয়ন মানুষ দিনে একবেলাও খেতে পারে না।

বছরে ৩০ বিলিয়ন ডলার খরচ করলে, সারা পৃথিবী থেকে ক্ষুধা দূর করে ফেলা সম্ভব। একটি লোকও তখন না খেয়ে থাকবে না। অথচ বছরে ১২০০ বিলিয়ন ডলার খরচ হয় অস্ত্রের পেছনে। একটি বিশেষ দেশের খাবার অপচয়ের পেছনে নষ্ট হয় ১০০ বিলিয়ন ডলার। ‘অবিস’ বা অতিরিক্ত মোটারা বছরে ২০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত খাবার খায়।[১৭৪] একদিকে মানুষ না খেয়ে মারা যায়, আর অন্যদিকে মানুষরা অতিরিক্ত খেয়ে ধুঁকে ধুঁকে মারা যায়।

৪) আর তারপর এমন সব মানুষদের একজন হয়ে যাওয়া, যারা গভীর বিশ্বাস করেছে এবং একে অন্যকে ধৈর্য ধারণ করতে তাগাদা দেয় এবং একে অন্যকে দয়া-মমতার প্রতি তাগাদা দেয়। তারাই তো সৌভাগ্যবান দল।

দাসদের মুক্তি দেওয়া, এতিমদের দায়িত্ব নেওয়া, গরিবদের সাহায্য করা —মানুষের প্রতি এই দায়িত্বগুলো পালন করা সহজ নয়। এর জন্য গভীর বিশ্বাস দরকার। একইসাথে মানুষকে ধৈর্য ধরতে তাগাদা দিতে হয়। কারণ এই কাজগুলো করার জন্য সময় এবং পরিশ্রম দুটোই দরকার। দাসদের মুক্ত করা মোটেও সহজ নয়। এর জন্য আইনি জটিলতায় যেতে হবে। দিনের পর দিন আন্দোলন করতে হবে। দাস ব্যবসায়ীদের আক্রমণের শিকার হতে হবে। নানা প্রতিকুলতার মধ্যে ধৈর্য ধরে, মানুষকে দয়া-মমতা-সহমর্মিতার প্রতি অটুট থাকার জন্য তাগাদা দিতে হবে।

আর সমাজের অভাবী মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানোর জন্য একসাথে মিলে কাজ করতে হবে। নানা বাধা আসবে। ঐক্য নষ্ট হয়ে যাবে। মানুষ হাল ছেড়ে দেবে। কিন্তু তারপরেও ধৈর্য ধরে, একে অন্যকে দয়া-মমতার আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে এগিয়ে যেতে হবে।

যারা এই সংগ্রাম করে যাবেন, তারাই একদিন হবেন জান্নাতের পথে এগিয়ে চলা সৌভাগ্যবান কাফেলার একজন।

কিন্তু এরপরেও যারা আমার বাণী অস্বীকার করেছে, তারা হতভাগার দল। এদেরকে চারিদিক থেকে আগুন ঘিরে ফেলবে।

দাসদেরকে মুক্তি দেওয়া, অভাবের সময় এতিম, গরিবদের খাবার দেওয়া, নিজে বিশ্বাসী হয়ে অন্যদেরকে ধৈর্য এবং দয়া-মমতার প্রতি আহবান জানানো —এগুলো সবই সর্বজন স্বীকৃত ভালো কাজ। কোনো মানুষ বলবে না যে, এগুলোর একটাও অপ্রয়োজনীয় কাজ। কিন্তু কিছু মানুষ আছে, যারা এগুলো করবে তো না-ই, করার দায়-দায়িত্বও অস্বীকার করবে। এরা মানুষ নামের পশু। এইসব নরপশুরা হবে কিয়ামতের দিন হতভাগার দল। ভীষণ শাস্তি অপেক্ষা করছে এদের জন্য।

[১] বাইয়িনাহ এর কু’রআনের তাফসীর। [২] ম্যাসেজ অফ দা কু’রআন — মুহাম্মাদ আসাদ। [৩] তাফহিমুল কু’রআন — মাওলানা মাওদুদি। [৪] মা’রিফুল কু’রআন — মুফতি শাফি উসমানী। [৫] মুহাম্মাদ মোহার আলি — A Word for Word Meaning of The Quran [৬] সৈয়দ কুতব — In the Shade of the Quran [৭] তাদাব্বুরে কু’রআন – আমিন আহসান ইসলাহি। [৮] তাফসিরে তাওযীহুল কু’রআন — মুফতি তাক্বি উসমানী। [৯] বায়ান আল কু’রআন — ড: ইসরার আহমেদ। [১০] তাফসীর উল কু’রআন — মাওলানা আব্দুল মাজিদ দারিয়াবাদি [১১] কু’রআন তাফসীর — আব্দুর রাহিম আস-সারানবি [১২] আত-তাবারি-এর তাফসীরের অনুবাদ। [১৩] তাফসির ইবন আব্বাস। [১৪] তাফসির আল কুরতুবি। [১৫] তাফসির আল জালালাইন। [১৬] লুঘাতুল কুরআন — গুলাম আহমেদ পারভেজ। [১৭] তাফসীর আহসানুল বায়ান — ইসলামিক সেন্টার, আল-মাজমাআহ, সউদি আরব [১৮] কু’রআনুল কারীম – বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর — বাদশাহ ফাহাদ কু’রআন মুদ্রণ কমপ্লেক্স। [১৯] তাফসির আল-কাবির। [২০] তাফসির আল-কাশ্‌শাফ। [৪০৮] Anti-Slavery International. (2018). What is modern slavery? – Anti-Slavery International. [online] Available at: https://www.antislavery.org/slavery-today/modern-slavery/ [Accessed 25 Mar. 2018].


ফেসবুকে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। Gournadi.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে Gournadi.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

Source
সর্বপ্রথম প্রকাশঃ কুরআনের কথা ওয়েব সাইটে। বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি ওমর আল জাবির এর প্রতি

আরো পোষ্ট...