আন্তর্জাতিকজাতীয়

‘গভীর সংকটে বাংলাদেশ’

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষক এবং সাংবাদিক হিসেবে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছেন কানাডার নাগরিক গোয়েন ডায়ার। তার লেখা মতামত বিশ্বের ৪৫টির ও বেশি দেশের পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে তার লেখা ‘ক্লাইমেট ওয়্যারস’ বইটি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোচিত এবং বইটি জাপানিজ, ফ্রেঞ্জ, রাশিয়ান, চাইনিজসহ কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। সম্প্রতি জাপান টাইমসে বাংলাদেশ নিয়ে একটি মতামত লিখেছেন গোয়েন ডায়ার। ‘বাংলাদেশ গভীর সংকটে’ শিরোনামে লেখা তার মতামতটির চৌম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে কট্টর প্রতিরোধ ব্যবস্থা কীভাবে মুক্ত চিন্তার বিকাশ ঘটাতে পারে? যারা ধর্ম নিয়ে সমালোচনা করেন এবং ধর্মের প্রতি অবিশ্বাসকে বিতর্কিতভাবে প্রকাশ করতে চান তাদের প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিন্দা প্রকাশ করে বলেছন, মুক্তচিন্তার নামে নোংরা ভাষায় কোনোকিছু লেখা হলে বিষয়টি আমি বরদাস্ত করব না। লোকজনকে কেন এভাবে লিখতে হয়? কেউ যদি আমাদের নবীজি কিংবা অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু লেখেন তবে তা মেনে নেওয়া হবে না।

সুতরাং তিনি কী এটা বোঝাতে চাচ্ছেন যে যারা এই ধরণের বইয়ের লেখক তাদের হত্যা করা ঠিক আছে? সচরাচর তাদের রামদা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা? তিনি বিষয়টির সমর্থন দেননি কিন্তু তিনি সরাসরি না ও বলেননি। বিষয়টি অনুশোচনীয় যে সম্প্রতি বাংলাদেশে কিছু মানুষ এরকম হত্যার শিকার হচ্ছেন।

সম্প্রতি যারা হত্যার শিকার হয়েছেন তাদের বেশিরভাগই ‘নাস্তিক’ ব্লগার যারা জনসম্মুখে নিজের ধর্মে অবিশ্বাসের কথা স্বীকার করেছেন এবং কেন তারা ধর্মে অবিশ্বাস করেন সে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। তারা সরাসরি ইসলামের সমালোচনা করেননি কিংবা উপহাসও করেননি, তবে তারা দৃঢ় কণ্ঠে বলেছেন যে ধর্মে বিশ্বাসটা অপরিহার্য নয়। তাদেরকে হত্যার জন্য কিছু মানুষের কাছে এটাই ছিল ছিল বিরাট কারণ।

গত বছর বাংলাদেশে চারজন হাই-প্রোফাইল ব্লাগারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তবে তাদের হত্যার পর যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি নজরে এসেছে তা হচ্ছে হত্যার বিষয়টি নিয়ে সরকারের প্রতিক্রিয়া।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমন একটি দেশ পরিচালনা করেন যে দেশে সাংবিধানিকভাবে বাক স্বাধীনতার কথা উল্লেখ রয়েছে এবং দেশটিতে সকল ধর্মের লোকেরা সমানভাবে বিবেচিত হবেন বলে উল্লেখ রয়েছে। যখন দেশটির প্রধানমন্ত্রী লোকজনের সামনে হত্যার নিন্দা জানানোর পাশাপাশি ব্লগারদের কাজকে খারাপ বলে বক্তব্য দেন তখন বোঝা যায় তিনি বলতে চাচ্ছেন যে তারা হত্যার যোগ্য।

তিনি এ বিষয়টিও উল্লেখ করেন যে বিরোধী দল বিএনপি এবং তাদের জোটসঙ্গী দেশের সবচেয়ে বড় ইসলামী দল জামায়াতে ইসলাম এ হত্যায় যুক্ত। তবে দেশে ইসলামিক স্টেট কিংবা আল-কায়েদার উপস্থিতি থাকাকে অস্বীকার করেছেন তিনি।

বিদেশি কোনো ইসলামী জঙ্গী সংগঠন হত্যার ঘটনায় যুক্ত এমনটা স্বীকার করলে দেশ রক্ষায় তিনি ব্যর্থ এমনটা প্রমাণ পাবে এজন্য ঘটনাগুলোর দায় বিরোধী দলগুলোর উপর চাপানো তার রাজনীতির একটি ভালো দিক। কিন্তু হত্যাকারীদের প্রতি তার নিস্ক্রিয়তার কারণে চরমপন্থীদের হত্যার টার্গেট বাড়ছে।

এপ্রিলের ২৩ তারিখ খুন হন অধ্যাপক রেজাউল করিম। তিনি একটি সাহিত্য ম্যাগজিনের সম্পাদনা করতেন এবং একটি গানের একটি স্কুলের প্রতিষ্ঠা করেছেন। কিন্তু কখনোই ব্লগ কিংবা ধর্ম নিয়ে কিছুই লিখেননি। নিজ কর্মস্থল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সময়ে তাকে গলাকেটে হত্যা করা হয়। তিনি ইসলামিক আচার-আচরণগুলো মেনে চললেও এমন কিছু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলেন যেগুলো চরমপন্থীদের মতো অনৈসলামিক।

এর একদিন পর খুন হন সমকামী অধিকারকর্মী এবং সমকামী ম্যাগাজিনের সম্পাদক জুলহাজ মান্নান এবং তার বন্ধু নাট্যকর্মী মাহবুব রাব্বী তনয়। সম্প্রতি আরও কিছু সহিংসতায় আক্রমণের স্বীকার হয়েছেন ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা। এরমধ্যে ছিল শিয়া এবং আহমাদি মসজিদে হামলা, খ্রিষ্টান পাদ্রি এবং হিন্দুদের উপর হামলা।

সুতরাং বাংলাদেশের সমাজ কী আস্তে আস্তে এর পূর্বের শাসক পাকিস্তানের মতো হতে যাচ্ছে যে সমাজে সংখ্যালঘু বিরোধী সন্ত্রাসী কার্যক্রম বাড়ছে? দুর্ভাগ্যজনক হলেও এ প্রশ্নের জবাব হ্যাঁ এবং এর এর দোষ মূলত বাংলাদেশে দীর্ঘদিন যাবত ক্ষমতায় থাকা দুই নারী নেত্রীর উপর বর্তায়।

এই দুই নেত্রীর একজন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের বেঁচে যাওয়া দুই সদস্যের মধ্যে একজন শেখ হাসিনা। তিনি ১৯৭৫ সালে সেনা অভ্যুন্থানে নিহত হন। অপরজন ইসলামকে বাংলাদেশের জাতীয় ধর্ম ঘোষণা করা বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট নিহত জেনারেল জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া। ১৯৮১ সালে এক সেনা অভ্যুন্থানে নিহত হন তিনি।

শেখ হাসিনার দল আওয়ামীলীগ ধর্ম নিরপেক্ষতাকে বহন করে, অপরপক্ষে খালেদা জিয়া নেতৃত্বাধীন বিএনপির মূল সমর্থক রক্ষণশীল শিয়া মুসলিমরা। এই বিভেদটা প্রত্যেকটা ইসলামিক রাষ্ট্রেই আছে। কিন্তু গত ২৫ বছর যাবত পারস্পারিক ঘৃণা ছাড়নোর মাধ্যমে এই বিভেদটাকে আরও বড় করে তুলেছেন এই নেত্রী।

বিএনপি ইসলামিক দলের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে ধর্মীয় চরমপন্থীদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা চলাচ্ছে এবং হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ইসলামিক অনুভূতিকে নিয়ে কূটনামী করে (ভোট না হারানোর জন্য) একইভাবে দল পরিচালনা করছেন। নি:সন্দেহে বাংলাদেশে সক্রিয় ইসলামিক স্টেট এবং আল-কায়েদা। বাংলাদেশ এখন গভীর সংকটে।


ফেসবুকে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। Gournadi.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে Gournadi.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো পোষ্ট...

Leave a Reply