জাতীয়

মাওলানা নুরুল ইসলামকে নিজ বাসায় জবাই করে হত্যা

চ্যানেল আই এর ইসলামিক অনুষ্ঠান ‘কাফেলা’ অনুষ্ঠানের জনপ্রিয় উপস্থাপক ও ইসলামী ফ্রন্টিয়ারের প্রেসিডিয়াম সদস্য মাওলানা শাইখ নুরুল ইসলাম ফারুকীকে রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারের নিজ বাসায় জবাই করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা।

শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চুরির উদ্দেশ্যে তার বাসায় দুর্বৃত্তরা গেলে তিনি বাধা দিলে তাকে হত্যা করা হয়।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

তেজগাঁও জোনের ডিসি বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, ‘আমি ঘটনাস্থলে আছি। কে বা কারা নুরুল ইসলামকে হত্যা করেছে এ বিষয়ে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না।’

তিনি চ্যানেল আইয়ের জনপ্রিয় ইসলামিক অনুষ্ঠান ‘শান্তির পথে’ ও ‘কাফেলা’ অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা করতেন। তাঁর মৃত্যুতে চ্যানেল আই পরিবার গভীর শোকাহত।

ফারুকীর মরদেহ ঢাকা মেডিকেলে

রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারে নিজ বাসাতে দুর্বৃত্তদের হাতে খুন চ্যানেল আইয়ের উপস্থাপক মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকীর মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

বুধবার রাত ১টা ২৫ মিনিটে তার বাসা থেকে মরদেহ আলী মেডিকেল সার্ভিসেসের একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে লাশের ময়নাতদন্ত করা হবে।

এর আগে পুলিশের ক্রাইম বিভাগের একটি দল বাসার ভেতর থেকে হত্যাকাণ্ডের আলামত সংগ্রহ করে।

এদিকে, অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ নিয়ে যাওয়ার সময় তার বিক্ষুব্ধ অনুসারীরা বিভিন্ন স্লোগান দেয় এবং একটি মিছিল নিয়ে ফার্মগেট পর্যন্ত যায়।

হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত মনে করছেন অনুসারীরা

জনপ্রিয় ধর্মীয় অনুষ্ঠান কাফেলা’র উপস্থাপক মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতি বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে মনে করেন ফারুকীর অনুসারী ও ঘনিষ্ঠজনেরা।

তাদের দাবি ফারুকীকে পরিকল্পিতভাবেই খুন করা হয়েছে। তার ঘনিষ্ঠজন ও বাসার সামনে ‍বিক্ষোভরত অনুসারীদের মনোভাব এমনই।

বুধবার রাতে ফারুকীকে হত্যার আগে দু্র্বৃত্তরা প্রথমে দাবি করে ৫০ লাখ টাকা। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের পর লকার থেকে মাত্র লক্ষাধিক টাকাসহ স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে যায়।

নৃশংস এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মো. বেলাল হোসেনের বরাত দিয়ে তার বড় ভাই ও নিহতের ঘনিষ্টজন মো. জালাল হোসেন সংবাদমাধ্যমকে এ তথ্য জান‍ান।

তিনি বলেন, সন্ধ্যায় তার ছোট ভাই বেলাল হোসেন আরো দুই অনুসারীসহ নুরুল ইসলাম ফারুকীর বাসায় যান। রাত ৮টার দিকে কয়েকজন লোক হজ্বে যাওয়ার বিষয়ে পরামর্শ করার কথা বলে ভেতরে আসেন। এর কিছুক্ষণ পরই তারা বেলাল হোসেনসহ ৩ জনের হাত-পা বেঁধে মুখে গামছা ঢুকিয়ে পাশের রুমে আটকে রাখে।

এরপর তারা ফারুকীর কাছে ৫০ লাখ টাকা দাবি করে। নুরুল ইসলাম এতো টাকা নেই মন্তব্য করে ৫ লাখ টাকা নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেন। আর তাতে রাজিও হয় তারা। এরপর ফারুকী লকার থেকে টাকা বের করার সময় তাকে কব্জা করে হত্যাকারীরা। পরে তাকে গলা কেটে হত্যা করা হয়।

মো. জালাল বলেন, ১৯৮৫ সাল থেকে রাজাবাজার আমতলিতে থাকি। তখন থেকেই হুজুরের সাথে পরিচয়। আস্তে আস্তে তার অনুসারী হয়ে যাই। আমার ভাইও হুজুরের অনুসারী। দুঃখজনক এ ঘটনা ঘটার আগে উত্তরা থেকে এসেছে বেলাল। সেখানেই ওয়ার্কসপের ব্যবসা রয়েছে তার।

মো. জালালসহ ফারুকীর বন্ধুবৎসল ও অনুসারীদের অনেকেই বলেন, এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। কিন্তু ঘটনাকে ডাকাতি বলে চালিয়ে দিতেই টাকা দাবি করার মাধ্যমে নাকট সাজিয়েছে হন্তারকরা।

এদিকে তেজগাঁও জোনের উপপুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর দুর্বৃত্তরা লকার থেকে দেড় লাখ টাকা ও বেশ কিছু স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে গেছে।

মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী জনপ্রিয় ধর্মীয় অনুষ্ঠান ‘শান্তির পথে’ ও ‘কাফেলা’ এর উপস্থাপক ছিলেন। সুন্নী মতবাদে বিশ্বাসী এই উপস্থাপক বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত বাংলাদেশের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন। এছাড়া মৃত্যুর আগ পর্যন্তও তিনি হাইকোর্ট মাজার মসজিদের খতিব ছিলেন।

বুধবার রাত সোয়া ৯টার দিকে ১৭৪ নম্বর পূর্ব রাজাবাজারের ভাড়া বাড়িতে তাকে গলা কেটে হত্যা করে একদল দুর্বৃত্ত।

নির্মম এ হত্যা মেনে নিতে পারছেন না ভক্তরা

জনপ্রিয় ধর্মীয় অনুষ্ঠান ‘কাফেলার’ উপস্থাপক নুরুল ইসলাম ফারুকীর এমন করুণ মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না তার ভক্ত-অনুসারীরা।

তাই তারা প্রিয় এ মানুষটির মৃত্যুর খবর শুনেই মাঝরাতে ভিড় করেন ফারুকীর পূর্ব রাজাবাজারের বাসার সামনে।

রাতে বাসার সামনে গিয়ে দেখা যায় দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে এসেছেন হাজারো ভক্ত ও সাধারণ মানুষ।

বুধবার রাত সোয়া ৯টার পর সুপ্রিম কোর্টের খতিব ফারুকীর মৃত্যুর সংবাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে তাকে একনজর দেখতে বাসার সামনে ভিড় করতে থাকেন ভক্তরা। এ সময় তারা একে অপরকে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

সংবাদ শুনে নরসিংদী থেকে ছুটে এসেছেন আবু তাহের নামের এক ভক্ত। তিনি বলেন, হুজুরকে এমন নৃশংসভাবে যারা হত্যা করেছে তারা ইসলামের শত্রু। ইসলামকে ধ্বংস করতেই তারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনার ঢাকা মহানগরের সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেন তুষার বলেন, হুজুরকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যায় উচ্চমহলের হাত রয়েছে।

তিনি বলেন, হুজুর দেশের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলতেন। এজন্য একটি মহল হুজুরকে দীর্ঘদিন ধরেই হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছিল। তারাই পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

ফারুকী ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস এজেন্সির মালিক নুরুল ইসলাম ফারুকীর দু’ঘরে রয়েছে সাত ছেলে মেয়ে। মৃত্যুর আগে পূর্ব রাজাবাজারের ১৭৪ নম্বর বাসার তৃতীয় তলায় দ্বিতীয় স্ত্রী রুবিনার সঙ্গে থাকতেন সে।

নিহতের ছেলে ফয়সাল ফারুকী বলেন, হজ্বে যাওয়ার কথা বলে সন্ধ্যার দিকে দু’জন লোক বাসায় ঢোকে। বাসার নিচে আরও কয়েকজন অপেক্ষা করছে বললে বাবা তাদের উপরে নিয়ে আসতে বলেন।

এরপর নিচ থেকে ৫/৬ জনে যুবক পিস্তল ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে রুমে ঢোকে। রুমে ঢুকেই তার‍া অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে সবাইকে বেঁধে ফেলে। এরপর গলা কেটে বাবাকে হত্যা করে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

যারা আমার বাবাকে এমন নৃশংসভাবে হত্যা করে আমাদের এতিম করলো তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে তিনি।

তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, খুনিরা হাত-পা বেঁধে গলা কেটে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। আলামত সংগ্রহ শেষ হয়েছে। তদন্ত কাজও শুরু করেছি। কোনো একটি বিষয়কে গুরুত্ব না দিয়ে সব বিষয়কেই আমলে নিয়ে আমরা কাজ করবো।

দ্রুত খুনিদের গ্রেফতার করে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করা হবে বলেও জানান তিনি।


ফেসবুকে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। Gournadi.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে Gournadi.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো পোষ্ট...