জাতীয়

‘ভোটের প্রক্রিয়াটাই সাজানো চেহারা’

বিএনপি দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম ছাত্রনেতা। ২৮ এপ্রিল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা ভোট কারচুপি, জালিয়াতি, নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন থেকে নিজেদের সমর্থিত প্রার্থী প্রত্যাহার করে নেয়। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব, সরকার ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নির্বাচন প্রভাবিত করা এবং সংঘর্ষ-সংঘাত এই সমস্ত কিছু নিয়ে কথা বলেছেন বিএনপির সাবেক এই সংসদ সদস্য।

আমাদেরসময় : বিএনপির নির্বাচনে আসা। অতঃপর নির্বাচন বর্জন। কীভাবে দেখেন বিষয়টি?
জহির উদ্দীন স্বপন : বিএনপি খুব আন্তরিকভাবেই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিল। এবং এই নির্বাচন বিএনপির জন্য একটা সুযোগ হিসেবেই সামনে এসেছিল। কারণ ৩ মাস ধরে বিএনপির চেয়ারপারসন যেভাবে অবরুদ্ধ ছিলেন, হরতাল-অবরোধ কর্মসূচির নামে যে মহল থেকেই হোক, নিরহ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। ফলে কর্মসূচি একটি গণবিচ্ছিন্ন সহিংস চেহারা ধারণ করেছে। তার যে একটা জনবিরোধী-জঙ্গি-হিসাক চেহারা বাইরে বের হয়ে এসেছিল, সরকারি দল ও বিএনপি উভয়ে উভয়কে এ বিষয়ে দায়ী করছিল, সে রকম পরিস্থিতিতে সেই আন্দোলন জনসম্পৃক্ত আন্দোলনে পরিণত হতে পারেনি। সেখান থেকে বিএনপি আন্দোলনের নতুন মাত্রা তৈরি করার জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ তাদের জন্য একটা সুযোগ ছিল। এবং সেই সুযোগ তারা ভালোভাবে গ্রহণ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে পারেনি।

আমাদেরসময় : বিএনপি আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল, কেন পারেনি। আপনার ব্যাখ্যা কী?
জহির উদ্দীন স্বপন : কীভাবে পারবে? সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের পক্ষ থেকে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিভিন্নভাবে আক্রমণ করা হয়েছে, এমনকি বেগম জিয়ার গাড়িবহরে আক্রমণ হয়েছে। গণমাধ্যমে এ বিষয়ে সচিত্র সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে। এ বিষয়টিতে প্রমাণিত হয়েছে, বিএনপি চাইলেই নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক তৎপরতা, নির্বাচনী প্রচার করতে পারছে না। বিএনপি প্রচলিত হরতাল-অবরোধে সহিংসতার অভিযোগে অভিযুক্ত ছিল, রাষ্ট্রযন্ত্রের দ্বারা আক্রান্ত ছিল, নির্বাচনী প্রচারণায়ও তারা মামলা-হামলায় আক্রান্ত হয়ে পড়ল।

আমাদেরসময় : নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি, স্বতঃস্ফূর্ততা, সংঘাতৃ
জহির উদ্দীন স্বপন : সর্বশেষ তাদের ভরসা ছিল, নির্বাচনে সর্বশেষ ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত ভোটের স্বাভাবিক পরিবেশ যদি থাকে, তাহলে সেটার ওপর বিএনপি ভর করতে পারবে। দেশের সাধারণ মানুষও কিন্তু আশাবাদী হয়ে উঠেছিল, সংঘাতের রাজনীতির বদলে হয়তো একটা সুষ্ঠু ধারায় ফিরে আসবে। কারণ, সকলেই চায় একটি সুস্থ বিরোধী দল থাকুক। সুস্থ বিরোধী দলের অভাবে যেকোনো সরকারি দল সেটা বর্তমান হোক, অতীত হোক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। সরকারি দল নিজের অজান্তেই গণবিচ্ছিন্ন চরিত্র অর্জন করে। ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানবে পরিণত হয়। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে শক্তিশালী বিরোধী দলই কেবল সরকারকে স্বাভাবিক ও সুস্থ ধারায় চলতে বাধ্য করতে পারে। সেই সুযোগটা এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হতে পারে বলে সমস্ত বিবেকবান মানুষই প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু নির্বাচন চলাকালীন ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও সব গণমাধ্যম প্রশ্ন তুলছে, নির্বাচনী ব্যবস্থাটিকেই আসলে টিকিয়ে রাখা যাবে কি না। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের যদি ফুরিয়ে যায় তাহলে তার পরিণতি কী হতে পারে? সেই পরিণতির জন্য রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে সরকারি দল সচেতনভাবে প্রস্তুত কি না। রাজনীতি-সচেতন মানুষের কাছে এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

আমাদেরসময় : সিটি নির্বাচন বর্জন কি রাজনৈতিক কোনো কৌশল বিএনপির? নির্বাচন বর্জনের যৌক্তিক কোনো গ্রাউন্ড কি আছে? আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
জহির উদ্দীন স্বপন : বিএনপির সিটি নির্বাচন বর্জন অবশ্যই যৌক্তিক। তবে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণাটা বিএনপি একটু আগাম দিয়ে ফেলেছে। অন্তত বেলা তিনটা পর্যন্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ চলমান রাখা উচিত ছিল। কারণ গণমাধ্যমেই বলে দিয়েছে, নির্বাচনের নামে কী চলছিল। জনগণ জানার সুযোগ পেত, পর্যবেক্ষক দল দেখত, কী পরিস্থিতিতে বিএনপি নির্বাচন বর্জন ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের জনবল, এর বাইরে সরকারি দলের ছাত্রসংগঠন, যুব সংগঠন তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় তাদের নেতা-কর্মীদের ব্যালট বাক্স ছিনতাই, ভোট ছিনতাই, বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের আগে থেকে মামলা, হামলা চলছিল। নির্বাচনে লড়াই করার জন্য, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করার যে রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতা দরকার, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা দরকার, তা কিন্তু হারিয়ে গেছে। আমাদের এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকটটি হচ্ছে এই যে, গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতায় রাষ্ট্র, নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনসংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যদি নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালন না করে, তাহলে সেখানে কোনোভাবেই একটা সুষ্ঠু নির্বাচনী প্রতিযোগিতা হতে পারে না। আর সুষ্ঠু নির্বাচনী প্রতিযোগিতা না থাকলে সেখানে একধরনের স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থাই প্রতিষ্ঠিত হয়। উপরন্তু স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা নির্বাচনী ব্যবস্থাটিকেই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। যা গণতন্ত্রের জন্য আরও বড় অনেক ক্ষতি।

আমাদেরসময় : বিএনপি কি তাহলে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত দ্রুতই নিয়ে ফেলেছিল?
জহির উদ্দীন স্বপন: হ্যাঁ, বিএনপির নির্বাচন বর্জনের ঘোষণাটার সিদ্ধান্তটা আরও পরে দেওয়া উচিত ছিল। কোনো পক্ষ যদি অসহায় হয়ে যায়, নিরুপায় হয়ে যায়, নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানই যদি নিরপেক্ষ না থাকে, সে ক্ষেত্রে এই ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তির নির্বাচন বর্জন ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকে না। কারণ তাকে তো প্রতিযোগিতাতেই থাকতে দেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু এই অন্যায়ের প্রতিবাদে শুধু দল হিসেবে প্রতিক্রিয়া দেখালে চলবে না, এই অন্যায়ের প্রতিক্রিয়া জনগণ পর্যন্ত পৌছানো এবং জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য গণমাধ্যমের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যে ধৈর্য ও কৌশল থাকতে হবে, যেটা তাড়াহুড়ার কারণে বিএনপি পারেনি। কারণ রাজনীতিতে সকল বিষয়ই চূড়ান্তভাবে জনগণের বিষয়। এটি কোনো ব্যক্তিগত বা দল কিংবা গোষ্ঠীর বিষয় নয়।

আমাদেরসময় : নির্বাচন বর্জনের পরও বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের বিপুলসংখ্যক ভোটপ্রাপ্তি। বিষয়টি বিএনপির জন্য কি আফসোস বাড়ায় না?
জহির উদ্দীন স্বপন : একটা বিষয় আমাদের বুঝতে হবে সুস্থ রাজনীতির ধারায় নতুন নতুন অসুস্থ ধারা যোগ হচ্ছে। আর এবারের নতুন মাত্রাটি হচ্ছে ইলেকশন মনিটরিং ওয়ার্কিং গ্র“প এবং গণমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, নির্বাচনসংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, প্রকৃত অর্থে নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি ছিল ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। কিন্তু যখনি এগারোটা-বারোটার পর থেকে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী ও সকল নেতা-কর্মী নির্বাচন কেন্দ্র বর্জন করল, তখন সঙ্গত কারণেই ভোট জালিয়াতি করার একতরফা সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল সরকারি দলের লোকজন। সেই ক্ষেত্রে এখন যে ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে পরিকল্পিত একটি ফলাফল তৈরি করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সিল মারা ক্ষেত্রেও কত শতাংশ সরকারি দলের পক্ষে মারতে হবে, আর কত শতাংশ সিল বিরোধী দলের বা বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীকে দিতে হবে ৃ। প্রকৃত ভোটারের উপস্থিতি ছিল ১৫ শতাংশ, ভোট প্রদান পরিসংখ্যান দাঁড়িয়েছে ৪৪ শতাংশ।

আমাদেরসময় : বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের এই প্রাপ্তি কি তবে নির্বাচন কমিশনই বা আওয়ামী লীগদলীয় লোকেরাই করেছে? ব্যালান্স ঠিক রাখার জন্য?
জহির উদ্দীন স্বপন : নির্বাচন কমিশন করেনি, যারা ভোট জালিয়াতি পরিকল্পিতভাবে সিল মারা কাজটি করেছে একতরফাভাবে, ফলে তারা এটি বুদ্ধির সঙ্গেই করেছে। কারণ তাদের এই সিল মারার পরিপ্রেক্ষিতেই তো ভোট গণনা হবে। এটি তো গণমাধ্যম প্রকাশ করবে। গণমাধ্যমের প্রকাশিত সংবাদ মানুষ দেখেছে, পড়েছে যদিও আজকাল অনেক গণমাধ্যম অনেক গোষ্ঠী, ব্যক্তির স্বার্থ উদ্ধারে কাজ করে। ওইসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পক্ষে-বিপক্ষে পারসেপশন ম্যানেজমেন্ট করে, জনমত তৈরি করে। কিন্তু প্রকৃত গণমাধ্যম তথ্যকে জনগণের সামনে তুলে ধরাটাই কাজ। সেই বিবেচনায় দেশের গণমাধ্যমকে খেয়াল করলে দেখব প্রকৃত ভোটার উপস্থিতি ছিল কত, ফলাফলে হাজিরা দেখানো হয়েছে কত। প্রকৃত ভোট যদি পনেরো পার্সেন্ট হয়, তাহলে বাকি ভোট কোথা থেকে এলো? আর বাকি ভোট যদি দেখাতেই হবে, সেখানে পুরোটাই যদি সরকারি দলে চলে যায়, এখন যে প্রশ্নটা আসছে, তখন তা আসত না। বিএনপি সাংগঠনিকভাবে এতই দুর্বল প্রমাণিত হয়েছে, তার পক্ষে ভোটার সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। বিএনপির ভোটারেরা ভোট কেন্দ্রে কেন যাবে? সরকার বা আওয়ামী লীগের কূটকৌশলের কাছে বিএনপি অবশ্যই পরাজিত হয়েছে। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা বেলা এগারোটা-বারোটার মধ্যে ভোট বর্জন করেছিল, সে হিসাবে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা এত ভোট পেয়েছে, তাদের পক্ষে এত ভোট আসবে কোথা থেকে?

আমাদেরসময় : বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা যে ভোট পেয়েছে, সেগুলো প্রকৃত প্রাপ্ত ভোট নয়? যে ভোট দেখানো হয়েছে, তা বানানো?
জহির উদ্দীন স্বপন : ভোটের প্রক্রিয়াটাই সাজানো চেহারা। জালিয়াতিটা পরিকল্পিত। কত অংশ পক্ষে নিতে হবে, কত অংশ বিপক্ষে দিতে হবে এটা পরিকল্পনা করেই হয়েছে। এটা তারা করতে পেরেছিল এ কারণেই যে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা আগেভাগে নির্বাচন বর্জন করেছিল বলেই।

আমাদেরসময় : সরকারদলীয়রা ভোট নিয়ে ছলচাতুরী করবে, নানা কৌশল নেবে তা কি বিএনপি জানত না? বিএনপি কি আওয়ামী লীগের কৌশলের কাছে পরাজিত হয়েছে? ব্যর্থ হয়েছে?
জহির উদ্দীন স্বপন : আওয়ামী লীগের হাতে রাষ্ট্রযন্ত্র থাকায়, ক্ষমতা ও কৌশল প্রয়োগ উভয় ক্ষেত্রেই সে এখন বেপোরোয়া। তাছাড়া বিএনপি আন্দোলনের নামে শুধুই গদবাধা পথেই হাটছে। ফলে সরকার প্রতিদিন জনমনে ক্ষোভ উৎপাদন করলেও তাকে আন্দোলনের শক্তি হিসাবে রুপান্তিরত করতে পারছে না বিএনপি। পুরো প্রেক্ষাপট নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে হবে বিএনপিকে।


ফেসবুকে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। Gournadi.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে Gournadi.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো পোষ্ট...

Leave a Reply