জাতীয়

সাঁতার শেখা জরুরি, পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু বেশি

মুসলিমা জাহান সেতু : বৃষ্টিহীন আষাঢ়ের মেঘলা দিন। কয়েক দিন টানা বর্ষণের পর একটুখানি বিরতি নিয়েছে প্রকৃতি। এমন এক বিকেলে ২৪ বছরের রেহানা বেগম ঘরের সামনের উঠানে প্রতিবেশীদের সঙ্গে মেতেছিলেন গল্পে, সঙ্গে পেয়ারা খাওয়া। সঙ্গী হিসেবে মা আর ভাবি ছিলেন। হঠাৎ ঘুমন্ত মেয়ের কথা মনে পড়ায় ঘরে ফিরে আসেন রেহানা। কিন্তু এ কী! বিছানা খালি, মেয়ে কোথাও নেই। শুরু হয় কান্নাকাটি। পাড়া-প্রতিবেশীরা লেগে যান শিশুটির খোঁজে। একপর্যায়ে দিনের শেষ আলোয় শিশুটিকে পদ্মফুলের মতো ভাসতে দেখা যায় ঘরের পেছনের পুকুরের পানিতে।
দুর্ঘটনাটি এ বছরের জুন মাসে বরিশালের গৌরনদী উপজেলার মাহিলারা ইউনিয়নের শরীফাবাদ গ্রামে ঘটে। রেহানা জানান, মাত্র আট আগে তিনি বিধবা হয়েছেন। শ্বশুরবাড়ির পাট গুটিয়ে স্থায়ীভাবে ফিরে আসেন বাবার বাড়িতে। একমাত্র সন্তানকে আশ্রয় করেই কাটাতে চেয়েছিলেন বাকি জীবন। কিন্তু পানির কাছে হেরে গেলেন রেহানা।
সন্তানকে হারিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত রেহানা বর্তমানে চিকিৎসাধীন। তাঁর একটাই আফসোস, কেন মেয়েকে চোখে চোখে রাখলেন না, তাহলে এমন সর্বনাশ হতো না।
চার বছরের ফুটফুটে মেয়ে নাদিয়া। আধো আধো বোলে মিষ্টি করে কথা বলে, মায়ের কাছে বিভিন্ন বায়না ধরে। মা প্রতিশ্রুতি দেন, প্রবাসী বাবা দেশে এলেই সব পূরণ হবে। খেলতে ভালোবাসে নাদিয়া। ১৭ আগস্ট খেলতে খেলতেই পৃথিবীকে বিদায় জানাল ছোট্ট শিশুটি। দুপুরে সবার অজান্তে বাড়ির পাশের পুকুরে খেলতে গিয়েছিল। মা ব্যস্ত ছিলেন সাংসারিক কাজে। হঠাৎ মায়ের খেয়াল হয় নাদিয়ার কথা। শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। পুকুরের পানিতে ভাসমান অবস্থায় নাদিয়াকে উদ্ধার করেন প্রতিবেশীরা। এরপর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনাও ঘটেছে গৌরনদী উপজেলায়।
শুধু গৌরনদী নয়, সারা দেশের চিত্রই এমন।
বাংলাদেশ হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে (বিএইচআইএস) প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ পানিতে ডোবা, অর্থাৎ অন্য যেকোনো রোগ বা কারণে মৃত্যুর চেয়ে পানিতে ডুবে শিশু মারা যাওয়ার সংখ্যা অনেক বেশি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ৩০ মিনিটে একজন শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়, সারা দিনে সংখ্যাটি দাঁড়ায় ৫০-এ।
নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর, পুকুর-ডোবা নিয়ে গঠিত এই ব-দ্বীপে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু একটি প্রধানতম সমস্যা। এ দেশে প্রতিবছর ২২ হাজার লোক পানিতে ডুবে মারা যায়। আর এর বড় অংশই শিশু। এক থেকে ১৭ বছর বয়সী কমপক্ষে ১৮ হাজার শিশুর পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়। মারা যাওয়া বেশির ভাগ শিশুর বয়স ১০ মাস থেকে দুই বছরের মধ্যে। এরা মূলত পরিবারের পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধানের অভাবে দুর্ঘটনার শিকার হয়। তবে পাঁচ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যু হয় সাঁতার না জানার কারণে।
বিএইচআইএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সকাল নয়টা থেকে বেলা দুইটার মধ্যেই সাধারণত দুর্ঘটনাগুলো ঘটে। এ সময় মায়েরা সাংসারিক নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন। সন্তানের খেয়াল রাখতে পারেন না। তবে গ্রামে সন্ধ্যায় হাত-মুখ ধুতে গিয়েও অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া পুকুর বা নদীতে গোসলের সময়ও অনেক শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়।
বছরজুড়েই এ দুর্ঘটনার শিকার হয় শিশু-কিশোরেরা। তবে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে যায়। বর্ষার নতুন পানিতে শিশুদের অবাধ বিচরণ একটি কারণ। এ ছাড়া পানির উৎস যত কাছাকাছি থাকে, মৃত্যুঝুঁকি ততই বেশি। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ শিশুই বাড়ি থেকে ২০ মিটার এবং একেবারে ছোট বাচ্চারা ১০ মিটার দূরত্বের কোনো পুকুর বা জলাশয়ের মধ্যে পড়ে মারা যায়।
পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধের একমাত্র উপায় সাঁতার শেখা। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ড্রাউনিং রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশের (আইডিআরসিবি) তথ্য অনুযায়ী, শুধু সাঁতার শেখানোর মাধ্যমেই ৯৬ শতাংশ মৃত্যু রোধ করা সম্ভব। কিন্তু দুর্ঘটনার শিকার পরিবার ও লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাঁতার শেখানোর বিষয়টি তাঁদের কাছে গুরুত্বহীন। তাঁরা বলেন, সাঁতার শেখানোর কী আছে। বাচ্চারা পানিতে দাপাদাপি করতে করতেই শিখে যায়। এ ছাড়া পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু একটি প্রধান সমস্যা হলেও বিষয়টি সমাজে উপেক্ষিত। এ বিষয়ে গৌরনদী উপজেলার বাসিন্দা মো. সেকান্দার মৃধা বলেন, সাঁতার শেখানোর বিষয়ে সরকার থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেই কেবল সাধারণ মানুষ এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারবে।
বিএইচআইএসের তথ্য অনুযায়ী, গ্রামে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হার অনেক বেশি হলেও শহরে উল্লেখযোগ্য। ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন নদী ও বস্তিতে পানিতে ডুবে দুর্ঘটনার সংখ্যা কম নয়। অধিকাংশ বস্তিই নিচু এলাকা বা ঝিলের ওপর গড়ে ওঠে। বর্ষায় এসব জায়গা পানিতে ডুবে যায়।
সরকারি পর্যায়ে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে এখনো কোনো কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। তবে এ নিয়ে কাজ শুরুর প্রক্রিয়া চলছে। তবে বেসরকারি পর্যায়ে বেশ কয়েকটি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

প্রথম প্রকাশ : http://www.prothom-alo.com/we-are/article/43319


ফেসবুকে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। Gournadi.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে Gournadi.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো পোষ্ট...

Leave a Reply