গৌরনদী সংবাদ

আ’লীগ-বিএনপির ১৬ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ১৫ কোটি টাকার সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টা

জমির ভূয়া পত্তন দেখিয়ে আদালত থেকে পৃথক তিনটি ডিগ্রি হাসিল করায় বরিশালের গৌরনদী পৌর আ’লীগ ও বিএনপিসহ ১৬ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে গৌরনদী পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সুপার মার্কেটের প্রায় ১৫ কোটি টাকা মূল্যের ৮৮ শতাংশ জমি আত্মসাতের চেষ্টা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এদিকে, বিদ্যালয় কর্তুপক্ষের যোগসাজশে এসএমসি’র ৩ সদস্য, আ’লীগ ও বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী সুপার মার্কেটের লিজকৃত ৪০টি প্লটে এক থেকে চারতলা পাকা ভবন নির্মাণ করায় সম্পত্তি বেহাত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানায়, উপজেলা সদরে উত্তর বিজয়পুর মৌজায় ১৯৩৬ সালে গৌরনদী পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদ্যালয়ের পূর্ব পাশের প্লটের (জমির) এস.এ ৩৪৬,৩৪৭নং দাগের ১১৪নং খতিয়ানের ৮৮ শতাংশ ভূমির এস.এ রেকর্ডের মালিক বিন্দু বাসিনী দেব্যা, সতীশ চন্দ্র, মনোরঞ্জন, চিত্তরঞ্জন ও উষা রঞ্জন।

১৯৬১-৬২ সালে দলিল ও ডিগ্রি মূলে ওই জমির প্রকৃত মালিক হয় গৌরনদী পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়। সেই থেকে বিদ্যালয়টি ওই সম্পত্তি ভোগ দখল করে আসছে। ওই সম্পত্তিতে বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস ছিল।

তৎকালীন সময়ে বরিশালের বৃহত্তর গৌরনদী, উজিরপুর, বাবুগঞ্জ, হিজলা, মুলাদী, মেহেন্দীগঞ্জ, বানরীপাড়া থানার মেট্রিক পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্র ছিল গৌরনদী। ওই সময় মেট্রিক পরীক্ষার কেন্দ্র হিসেবে ছাত্রাবাসটি ব্যবহৃত হতো।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. অলিউল্লাহ, এসএমসি’র সদস্য নয়ন শরীফ জানান, সড়ক ও জনপথ বিভাগ ১৯৮২ সালে গৌরনদী বাসষ্টান্ড এলাকায় বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের পাশে গঠে ওঠা অবৈধ আধাপাকা ও কাচা স্থাপনা উচ্ছেদ করলে ব্যবসায়ীরা অসহায় হয়ে পড়ে। তখন মানবিক কারণে ও বিদ্যালয়ের আয় বৃদ্ধির জন্য বিদ্যালয় কর্তপক্ষ ওই জমিতে ৫৬টি প্লট তৈরি করে সুপার মার্কেট হিসেবে ৫৬ জন ব্যবসায়ীকে লিজ প্রদান করে।

আ’লীগ ও বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীসহ লিজ গৃহীতারা বিদ্যালয়কে বাৎসরিক ধার্য্যকৃত লিজের ৩৫০ টাকা পরিশোধ করে আসছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গৌরনদী পৌর আ’লীগের সাধারন সম্পাদক মো. কবির হোসেন খান, সুপার মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আ’লীগ নেতা আবুল কালাম সরদার, পৌর কাউন্সিলর যুবলীগ নেতা মো. আতিকুর রহমান শামীম (এরা তিন)সহ আ’লীগ ও বিএনপির ১১ নেতাকর্মী ২০১২ সালে ও হাইকোর্ট জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের যুগ্মসম্পাদক মো. আলমগীর হোসেন ১৯৮২ সালে আদালত থেকে বিদ্যালয়ের ওই সম্পত্তি’র ওপর পৃথক দুইটি ডিগ্রী হাসিল করেন। ওই সম্পত্তির ২ শতাংশ জায়গা বরিশাল সড়ক ও জনপথ বিভাগ অধিগ্রহন করার পরও তাও (সওজের অধিগ্রহনকৃত জমি) ডিগ্রিভূক্ত করা হয়েছে।

অপরদিকে, নিলাম বলে ১৯৭৪ সালে গৌরনদী সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে ৫৪ ধারায় ডিগ্রিবাজ মোহন হাওলাদার, আবুল হোসেন মৃধা, আব্দুস ছালাম সরদার, আইজদ্দিন বেপারী স্কুলের ওই সম্পত্তিতে নামজারি করেন। অবশ্য, মোহন হাওলাদার গংরা ও আলমগীর হোসেন গোপনে আদালত থেকে কাগজপত্র তৈরি করলেও তা দিয়ে প্রকাশ্যে বিদ্যালয়ের সম্পত্তি’র মালিকানা এখনও দাবি করেননি।

সুপার মার্কেটের সরদার মনির মেকার বলেন, মোহন হাওলাদারকে ওই সম্পত্তির একাংশের মালিক স্বীকার করে আমি ও সুপার মার্কেটের লিজ গ্রহীতা মিঠু নন্দি, আব্দুল মালেক খান, সোহরাব সরদার, কালাম সরদার, কবির খানের স্ত্রীর নামে, শাহিন সরদার, সাহিদা বেগম, হারুন সরদার, ফারুক সরদারসহ কয়েকজনে মোহন হাওলাদারের কাছ থেকে ১৫ শতাংশ ভূমি খরিদ করে সাবরেজিষ্ট্রি দলিল করলেও তারা প্রকাশ্যে বলছেন না।

বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. আলাউদ্দিন ভূইয়া অভিযোগ করেন, স্কুলের ওই সম্পত্তির এস.এ রেকর্ডিয় মালিকদের ভূয়া পত্তন দেখিলে গৌরনদী পৌর আ’লীগের সাধারন সম্পাদক মো. কবির হোসেন খান, পৌর আ’লীগের সদস্য ও সুপার মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবুল কালাম সরদার, উপজেলা যুবলীগের আহবায়ক কমিটির সদস্য পৌর কাউন্সিলর মো. আতিকুর রহমান শামীম (এরা তিন জনই স্কুল পরিচালনা কমিটির সদস্য), আ’লীগ সমর্থক দুলাল কর্মকার, মুকুন্দ লাল মন্ডল, যতীন ভক্ত, কৃঞ্চকান্ত মন্ডল, মেরাজ হোসেন খান, শামছুল আলম তালুকদার, মো. শফিকুর রহমান ২০১২ সালে আউট জুরিডিকশন বাবুগঞ্জ সহকারী জজ আদালত থেকে ডিগ্রী হাসিলের বলে বিদ্যালয়ের সম্পত্তি আত্মসাত করতে মালিকানা দাবি করেন। তারা ডিগ্রি হাসিল করে গত সেপ্টেম্বর মাসে গৌরনদী সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে নাম জারির আবেদন করলে বিষয়টি স্কুল কতৃপক্ষ টের পায়। তিনি আরো বলেন, আ’লীগ নেতাদের ডিগ্রী পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তারা ৬৬ বছর আগে পত্তন নেয়ার কথা উল্লেখ করলেও তাদের প্রত্যেকের বর্তমান বয়স ৪০ থেকে ৪৫ বছর। জন্ম নিবন্ধন অনুযায়ী যতিন ভক্তের বয়স ৪৮ বছর অথচ ৬৬ বছর আগে তার পত্তন নেয় বলে কাগজপত্রে দেখা যায়।

গৌরনদী পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক সরদার গোলাম হোসেন (গোলাম মাষ্টার) অভিযোগ করেন, বিদ্যালয়ের মূল্যবান সম্পত্তি আত্মসাতের উদ্দেশ্যে প্রভাশালীরা জাল জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বিদ্যালয় ওই সম্পত্তি ভোগদখল করে আসছে। প্রভাবশালী লোকজনরা লিজ গৃহীতা হয়ে প্রতিষ্ঠানের জায়গায় অবৈধ ভাবে পাকা ভবন নির্মাণ করে আত্মসাতের চেষ্টা দুঃখ জনক।

জাল জালিয়াতির অভিযোগ অস্বীকার করে গৌরনদী পৌর আ’লীগের সাধারন সম্পাদক এসএমসি’র অভিভাবক সদস্য মো. কবির হোসেন খান ও সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী কমিটির সভাপতি আ’লীগ নেতা কালাম সরদার বলেন, সম্পত্তিতে বিদ্যালয়ের কোন বৈধ কাগজপত্র নেই। বৈধ মালিক হিসেবে আমরা পাকা ভবন নির্মাণ করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছি । স্কুলের সাথে আমাদের কোন লিজের চুক্তিপত্র নেই তাই আমরা কোন খাজনাও স্কুলকে দেই না।

বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেন বলেন, স্কুলের সম্পত্তির কাগজপত্র করেছি, তবে বিদ্যালয়ের সম্পত্তি আত্মসাতের ইচ্ছা নেই।

সংবাদ : মোঃ আসাদুজ্জামান রিপন


ফেসবুকে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। Gournadi.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে Gournadi.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো পোষ্ট...

Leave a Reply