গৌরনদী সংবাদ

দেশব্যাপি অশান্তির মাঝেও শান্তির পরশ নিয়ে এলো একুশে বইমেলা

একুশে বই মেলার আয়োজক কমিটির বীরত্বপূর্ণ এ ঘোষণার পর পরই বই মেলায় উপস্থিত তরুন, যুবকসহ সকল বয়সের হাজার-হাজার নারী-পুরুষেরা ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী অপশক্তিকে প্রতিহত করার দিপ্ত শপথ গ্রহণ করেন। ফলশ্রুতিতে পাঁচ দিনব্যাপী একুশের বই মেলার তৃতীয়দিনে গত সোমবার অন্যান্য দিনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুন বইপ্রেমি ও দর্শকদের উপস্থিতিতে পুরো মেলা প্রাঙ্গণে তিল ধারনের ঠাঁই ছিলোনা। ঘটনাটি বরিশালের উত্তর জনপদের গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া ডিগ্রি কলেজ প্রাঙ্গণের।

সূত্রমতে, চলমান অবরোধ ও হরতালে নাশকতাকারীদের পেট্রোল বোমা নিক্ষেপের ঘটনায় পাঁচজন নিহতের পর বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে আতঙ্কের জনপদ হিসেবে পরিচিতি পায় গৌরনদী উপজেলা। সর্বশেষ ওই উপজেলার মাহিলাড়া নামক এলাকায় গত ৭ ফেব্রুয়ারি চলন্ত ট্রাকে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপের ঘটনায় তিনজন নিহত হওয়ার পর পুরো মাহিলাড়া ইউনিয়নবাসীর মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পরে। বিশেষ করে অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পরে গত দু’বছর থেকে মাহিলাড়া ডিগ্রি কলেজ প্রাঙ্গণে আয়োজিত দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ পাঁচ দিনব্যাপী একুশে বইমেলা। অবশেষে মেলা উদ্যাপন কমিটির আহবায়ক, জেলার দু’বারের শ্রেষ্ঠ মাহিলাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়নবাসী অতীতের ন্যায় একুশে বইমেলা আয়োজনের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্যর কাছে তাদের প্রাণের দাবি উপস্থাপন করেন। চেয়ারম্যান সৈকত গুহ পিকলু ও ইউনিয়নবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে সাংসদ আলহাজ্ব আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ একুশে বইমেলার মাধ্যমে আতঙ্কের জনপদ মাহিলাড়ায় শান্তির সুবাতাস ফিরিয়ে আনার জন্য তার পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগীতার ঘোষণা করেন।

সেমতে মাহিলাড়া ইউনিয়ন পরিষদ ও মাহিলাড়া ডিগ্রি কলেজের যৌথ উদ্যোগে বেশ স্বল্প সময়ে ব্যাপক আয়োজনের মধ্যদিয়ে তৃতীয় বছরের ন্যায় পাঁচ দিনব্যাপী একুশে বইমেলার গতকাল সোমবার তৃতীয়দিন অতিবাহিত হয়েছে। মেলা উপলক্ষ্যে প্রতিবছরের ন্যায় সাংবাদিক খোকন আহম্মেদ হীরার প্রকাশনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘হৃদয়ে একুশ’ নামের স্মরণিকা। মেলায় ঢাকার বিভিন্ন প্রকাশনির ৩০টি বইয়ের স্টলের পাশাপাশি স্থানীয় কবি ও সাহিত্যিকদের আরো ১০টি বইয়ের ষ্টল বসেছে। সাথে রয়েছে মিডিয়া সেল, লেখক আড্ডা, ডিজিটাল কর্ণার ও মাহিলাড়া ইউনিয়ন ডিজিটাল তথ্য সেবা কেন্দ্রের স্টল। মেলার তৃতীয়দিন পর্যন্ত ১২টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে। বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সমন্ময়ে প্রত্যেহ আলোচনা সভা শেষে অনুষ্ঠিত হচ্ছে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রতিদিন বিকেল তিনটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত মেলাস্থলে সকল বয়সের হাজার-হাজার বইপ্রেমীদের উপস্থিতিতে নাশকতার আতঙ্ক কেটে আজ মাহিলাড়ায় বইছে একুশে বইমেলার শান্তির সুবাতাস।

সূত্রমতে, গত ২১ ফেব্রুয়ারি বিকেলে প্রধান অতিথি হিসেবে বরিশাল-২ আসনের সংসদ সদস্য এ্যাডভোকেট তালুকদার মোঃ ইউনুস মেলার উদ্বোধণ করেন।

বইমেলা উপলক্ষ্যে সাহিত্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রথমদিনের “জাগ্রত জনতা” মঞ্চে আলোচনা সভায় মাহিলাড়া ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ফিরোজ ফোরকান আহমেদের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব শাহ আলম খান, ভাইসচেয়ারম্যান সৈয়দা মনিরুন নাহার মেরী, ফরহাদ মুন্সী। রবিবার দ্বিতীয়দিনে “হেরিণু পল্লী জননী” মঞ্চে আলোচনা সভায় বীর মুক্তিযোদ্ধা কালিয়া দমন গুহর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক মোঃ শহীদুল আলম। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ মাসুদ হাসান পাটোয়ারী, আ’লীগ নেতা আবুল হোসেন মোল্লা।

তৃতীয়দিনে সোমবার “জননী জন্মভূমি” মঞ্চে আলোচনা সভায় প্রফেসর আব্দুল ওয়াহেদের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মুহাম্মদ জিয়াউল হক। আজ চতুর্থদিনে “আমরা তোমাদের ভুলবো না” মঞ্চে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোঃ ইসাহাক আলী সরদারের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বরিশালের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর মোঃ হানিফ।

বিশেষ অতিথি থাকবেন বিশিষ্ট লেখক ও সাংবাদিক অজয় দাস গুপ্ত। সমাপনী দিনের “নিশি বুঝি ভোর হলো” মঞ্চে আলোচনা সভায় উপাধ্যক্ষ মিয়া মোঃ আকবর আলীর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগ নেতা সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান সৈকত গুহ পিকলু বলেন, সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর সর্বাত্মক সহযোগীতা ও মাহিলাড়া ইউনিয়নের সকল রাজনৈতিক দলের সহাবস্থানের কারণে সর্বদলীয় কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের প্রেক্ষিতে গত কয়েকদিন পূর্বের আতঙ্কিত মাহিলাড়ায় এখন একুশের বইমেলা উপলক্ষ্যে সর্বস্তরের বইপ্রেমীদের উপস্থিতিতে মিলন মেলায় পরিনত হয়েছে। এজন্য তিনি (চেয়ারম্যান) ইউনিয়নবাসীর পাশাপাশি সরকারি গৌরনদী কলেজে অবস্থানরত বিজিবির সদস্য, থানার ওসি মোঃ সাজ্জাদ হোসেনের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

চেয়ারম্যান সৈকত গুহ পিকলু আরো বলেন, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস ভবিষ্যত প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যেই একুশের বইমেলার আয়োজন। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে গত দু’বছরের তুলনায় এবারের মেলায় তারুণ্যের যে উচ্ছ্বাস ও আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা নিঃসন্দেহে একুশে বইমেলার জন্য অনেক বেশি সুফল বয়ে আনবে। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস ভবিষ্যত প্রজন্মের মাঝে তুলে ধরতে মেলা প্রাঙ্গণের প্রধান আকর্ষন ছিলো ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধের শহিদের পাশাপাশি যাদের জন্য ধন্য এ দেশ তাদের প্রতিকৃতি দিয়ে দুর্লভ আলোকচিত্র প্রদর্শন।


ফেসবুকে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। Gournadi.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে Gournadi.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো পোষ্ট...

Leave a Reply