গৌরনদী সংবাদ

তিনি ছিলেন সবার দাদা

জন্ম জন্মান্তরীত রেওয়াজ মতে বাবার বাবাই দাদা, আবার বড় ভাইকেও দাদা বলা হয় কিন্তু বরিশালের গৌরনদীর এমনই একজন মহৎ ব্যক্তি যাকে জাতি-ধর্ম-বর্ন নিবিশেষে ছোট বড় সবাই সকল রেওয়াজ ভুলে গিয়ে এক নামেই চিনেছেন বা ডেকেছেন দাদা বলে। সত্যিই সে একজন সাদা মনের মানুষও ছিলেন বটে। গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলাসহ পাশ্ববর্তী উপজেলায় দাদাকে চেনেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়াই কষ্টকর। ৫৮ বছর বয়সেও কর্ম দক্ষতা তাকে কখনো পিছু হঠাতে পারেনি। সে সর্বক্ষন দক্ষতার সাথে সমাজের অবহেলিত মানুষের পক্ষে কথা বলতেও জড়িয়ে নিয়েছিলেন নিজেকে। পাশাপাশি বিনামূল্যে মানব সেবা ও সমাজ উন্নয়নে একাধারে নিরলসভাবে কাজ করেছেন তিনি। মহৎ সাদা মনের মানুষ বরিশালের ঐতিহ্যবাহী গৌরনদী প্রেসক্লাবের সহ-সম্পাদক ও দৈনিক সংবাদের স্থানীয় প্রতিনিধি সুশীল জয়ধরের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী ছিলো ৫ ডিসেম্বর। গত বছরের এইদিনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দাদা সুশীল জয়ধর ইহলোক ত্যাগ করেছেন। প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পৌর এলাকার দক্ষিণ বিজয়পুর মহল্ল¬ার সাংবাদিক সুশীল জয়ধরের বাসায় দিনভর প্রার্থনা অনুষ্ঠান। বিকেল চারটায় গৌরনদী প্রেসক্লাবের উদ্যোগে স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

১৯৫৫ সালে উজিরপুরের জল্লা ইউনিয়নের কাঠলবাড়ি গ্রামের খ্রীষ্টিয় পরিবারে জন্মগ্রহন করেন সুশীল জয়ধর। তার পিতা সুধীর জয়ধর। পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সুশীল জয়ধর হচ্ছেন সবার বড়। ১৯৭০ সালে মেট্টিকুলেশন পাশ করে ১৯৭৩ সালে বাবার পাশাপাশি সংসারের হাল ধরতে একটি এনজিও’র ফিল্ড সুপার ভাইজার হিসেবে দীর্ঘদিন দক্ষতার সাথে কাজ করেছেন তিনি। ১৯৯৯ সালে ওই এনজিওটি ক্রেডিট প্রোগ্রাম শুরু করার পর সমাজের দরিদ্র পরিবারের সদস্যদের সাথে অসদ আচারন করতে না পেরে তিনি এনজিও থেকে নিজেকে আড়াল করে নেন। ১৯৭৪ সালে তিনি গৌরনদীর দক্ষিণ বিজয়পুর এলাকায় জমি ক্রয় করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ২০০০ সালে তিনি শখের বসত সমাজের অবহেলিত জনগোষ্ঠীর দুঃখ দুর্দশার সচিত্র প্রতিবেদন সমাজের সচেতন ব্যক্তিদের কাছে তুলে ধরতে সাংবাদিকতার মহান পেশায় জড়িয়ে পড়েন। সেই থেকে আমৃত্যু পর্যন্ত শত প্রতিকুলতার মাঝেও তিনি দক্ষতার সাথে সাংবাদিকতার মহান পেশাকে আঁকড়ে রেখেছিলেন। সংবাদ সংগ্রহ থেকে শুরু করে ছবি তোলায় তার ছিলো প্রচুর আগ্রহ ও যথেষ্ট সুনাম। যেখানেই সংবাদের কথা শুনতেন তিনি সেখানেই ছুটে চলতেন। তিনি সর্বদা অসহায় দুঃস্থ পরিবারের প্রতি অতিদূর্বল ছিলেন। হেলথ প্রোগ্রামের ফামাস্টিট হিসেবেও তার সুনাম সুখ্যাতি ছিলো। বিনামূল্যে মানুষের চিকিৎসা সেবা দেয়াই ছিলো তার মূল উদ্দেশ্য। তার সহধর্মিনী শেফালী জয়ধর গৌরনদীর ক্যাথলিক মিশনের অলকা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ইনচার্জ হিসেবে ১৯৭২ সাল থেকে দক্ষতা ও সুনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন। ব্যক্তি জীবনে দাদা এক কন্যা সন্তানের জনক। তার কন্যা রোজ মেরী ওরফে করবি জয়ধর। তিনি (সুশীল জয়ধর) তাকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছেন। সবার প্রিয় দাদা সুশীল জয়ধরের সমাজ সেবার কাজে তার সহধর্মীনি ও তার কন্যা করবি জয়ধর সর্বদা তাকে আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। একজন সাদা মনের মানুষ হতে হলে যেসব গুনাবলী থাকা প্রয়োজন তার কোনটিরও কমতি ছিলোনা দাদা সুশীল জয়ধরের মাঝে। তিনি পাঁচজন পথ শিশুকে পিতার স্নেহে লালন পালন করে স্বাবলম্বী করেছেন। তিনি বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ, যৌতুক, এসিড সন্ত্রাস নির্মূল, এইডস্, যক্ষা প্রতিরোধ ও ধূমপান বিরোধী ইস্যুতে গ্রামের মানুষকে সচেতন করে তুলতে বিভিন্ন সামাজিক দায়িত্ব পালন করছেন। দাদা সুশীল জয়ধর সর্বদা সকলকেই এতো আপন করে ভাবতেন যেন, ধর্ম বর্ন নিবিশেষে সবাই তার পরম নিকট আত্মীয়। তিনি সকলের সুখের ভাগিদার না হতে পারলেও দুঃখের দিনে অনায়াসেই সবার পাশে গিয়ে ছাঁয়ার মতো দাঁড়িয়েছেন। তাই তাকে গৌরনদীবাসী একজন সাদা মনের মানুষ হিসেবেই আখ্যা দিয়েছিলেন। তিনি সত্যিকারের ভালবাসা দিয়ে গৌরনদীর রিকসা চালক থেকে শুরু করে দিনমজুর, কৃষক, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, প্রশাসনসহ অবহেলিত জনগোষ্ঠীর মনের মাঝে গভীর শ্রদ্ধার পাত্র হিসেবে স্থান করে নিয়েছিলেন। তাইতো তিনি আজো মরিয়াও বেঁচে আছেন গৌরনদীবাসীর অন্তরে।

সংবাদ : খোকন আহম্মেদ হীরা


ফেসবুকে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। Gournadi.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে Gournadi.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো পোষ্ট...

Leave a Reply