ফিচার

এতিমের হক প্রতিষ্ঠায় ইসলামের ভূমিকা: মাওলানা মিরাজ রহমান

এতিমের পরিচয়
এতিম শব্দটি আরবি, যার অর্থ নি:সঙ্গ। একটি ঝিনুকের মধ্যে যদি একটি মাত্র মুক্তা জন্ম নেয় তখন একে দুররে এতিম বা নি:সঙ্গ মুক্তা বলা হয়। ইবনু মন্জুর লিসানুল আরব অভিধানে বর্ণনা করেছেন।

اليتيم: الذي يموت أبوه حتى يبلغ الحلم، فإذا بلغ زال عنه اسم اليتيم، واليتيمة ما لم تتزوج، فإذا تزوجت زال عنها اسم اليتيمة.

অর্থ: এতিম এমন সন্তানকে বলা হয় যার পিতা মারা গিয়েছে, বালেগ হওয়া পর্যন্ত সে এতিম হিসাবে গণ্য হবে। বালেগ হবার পর এতিম নামটি তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। আর মেয়ে সন্তান বিয়ের পূর্ব পর্যন্ত এতিম বলে গণ্য হবে। বিয়ের পর তাকে আর এতিম বলা হবে না।

মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বালেগ হওয়ার পর আর কেউ এতিম থাকে না। [মেশকাত : পৃষ্ঠা নং ২৮৪] লিসানুল আরবে আরো বর্ণিত আছে যে, মানুষের মাঝে এতিম হয় পিতার পক্ষ থেকে আর চতুষ্পদ জন্তুর মধ্যে এতিম হয় মায়ের পক্ষ থেকে। যে সন্তানের বাল্যকালে তার মাতা মারা যায়, কিন্তু পিতা বেঁচে থাকে তাকে এতিম বলা হবে না।

এতিমের ব্যাপারে ১০টি হকের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে ইসলাম
ইসলাম এতিমের হক আদায়ের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। বিশেষ করে বয়স পূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিটি এতিমের ব্যাপারে ১০টি হকের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ১. এতিমের সম্পদ অন্যদের স্পর্শ করা নিষিদ্ধ। ২. কঠোরতা বা জোর করা নিষিদ্ধ। ৩. মর্যাদার অধিকার। ৪. রূঢ়তা ও দুর্ব্যবহার নিষিদ্ধ। ৫. খাদ্যের অধিকার। ৬. আশ্রয় প্রদানের অধিকার। ৭. বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত উত্তরাধিকার সংরক্ষণ। ৮. ইহসানের বা ভালো ব্যবহার করার অধিকার। ৯. ইনসাফের বা ন্যায় বিচারের অধিকার। ১০. ফাইর বা কাফেরদের যে মাল যুদ্ধ ছাড়া হস্তগত হয়। যেমন খেরাজ, জেযিয়া ইত্যাদি মালের অধিকার।

ইসলামে এতিম প্রতিপালনের ফজিলত
আল্লাহ তাআলার প্রিয় হাবিব, আমাদের নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় তাঁর পিতা আব্দুল্লাহ ইন্তেকাল করেন এবং ছয় বছর বয়সে মা আমিনাকেও হারান। তারপর তার লালন পালনের দায়িত্ব নিলেন দাদা আব্দুল মুত্তালিব। কিন্তু তিনিও মাত্র দুই বছর পর এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। সে হিসাবে তিনি ছিলেন সর্বদিক দিয়েই এতিম। তাই আল্লাহ তাআলা বলেন, তিনি কি আপনাকে এতিম রূপে পাননি? অত:পর আশ্রয় দিয়েছেন। তিনি আপনাকে পেয়েছেন পথহারা, অত:পর পথ প্রদর্শন করেছেন। আপনাকে পেয়েছেন নি:স্ব, অত:পর অভাবমুক্ত করেছেন। সুতরাং আপনি এতিমের প্রতি কঠোর হবেন না। [সূরা দুহা : ৬-৯]

একদিকে সর্বশ্রেষ্ঠ নবি ছিলেন এতিম, অপর দিকে এতিমরা হচ্ছে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও অসহায়। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুধমাতা হালিমা বর্ণনা করেন যে, এতিম হওয়ার কারণে শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে লালন পালন করার জন্য কেউ সম্মত হয়নি। আমার উট ছিল দুর্বল তাই আমি সবার শেষে গিয়ে পৌঁছি। এরপর আর কোনো উপায় না পেয়ে এতিম মুহাম্মদকে গ্রহণ করি। কিন্তু মহান করুণাময়ের অশেষ করুণায় আমার উট এমন সবল হলো যে, আমি আমার গোত্রের সবার আগে পৌঁছে গেলাম। শুধু তাই নয়, আমার স্তনের দুধ, বকরি ও অন্যান্য সকল বস্তুতে এই এতিম বালকের কারণে কল্পনাতীত বরকত ও রহমত নাজিল হতে থাকল। তাই তাদের প্রতি আল্লাহর করুণা ও রহমত রয়েছে, বিধায় পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এতিম প্রতিপালনে বিশেষ ফজিলত বর্ণিত রয়েছে। নিম্নে তার কিছু বর্ণনা করা হচ্ছে:

এক. এতিম প্রতিপালনে জান্নাতের উচ্চাসন লাভ হয় : সাহল বিন সাদ [রা.] হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি ও এতিম প্রতিপালনকারী জান্নাতে এভাবে থাকব। তিনি তর্জনী ও মধ্য অংগুলি দিয়ে ইঙ্গিত করলেন এবং এ দুটির মধ্যে ফাক করলেন। [বর্ণনায় বুখারি] এ হাদিসে এটাই প্রতীয়মান হয়, যে ব্যক্তি জান্নাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথী হতে চায় সে যেন এই হাদিসের উপর আমল করে এবং এতিম প্রতিপালনের প্রতি ব্রতী হয়। সার্বিক দিক থেকে তার প্রতি গুরুত্ব দেয়। কারণ আখেরাতে এর চেয়ে উত্তম আর কোনো স্থান হতে পারেনা।

অপর এক হাদিসে রয়েছে, আবু হুরায়রা [রা.] হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : আমি ও এতিম প্রতিপালনকারীর অবস্থান জান্নাতে এই দুই অংগুলির ন্যায় পাশাপাশী হবে। চাই সেই এতিম তার নিজের হোক অথবা অন্যের। (বর্ণনাকারী) মালেক বিন আনাস [রা.] তর্জনী ও মধ্যমা আংগুলি দ্বারা ইশারা করলেন। [সহিহ মুসলিম]

দুই. এতিম প্রতিপালনে রিজিক প্রশস্ত হয় এবং রহমত ও বরকত নাজিল হয় : আবু দারদা [রা.] হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, দুর্বল অসহায়দের আবেদনে আমাকে সাহায্য কর। তোমাদের দুর্বল-অসহায়দের কারণেই তোমরা সাহায্য ও রিজিক প্রাপ্ত হও। [আবু দাউদ]

আবু হুরায়রা [রা.] হতে বর্ণিত, নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন, মুসলিমদের ঐ বাড়ীই সর্বোত্তম যে বাড়ীতে এতিম রয়েছে এবং তার সাথে ভালো ব্যবহার করা হয়। সবচেয়ে নিকৃষ্ট ঐ বাড়ী যে বাড়ীতে এতিম আছে, অথচ তার সাথে খারাপ ব্যবহার করা হয়। অত:পর তিনি তার আঙ্গুলির মাধ্যমে বললেন: আমি এবং এতিম প্রতিপালনকারী জান্নাতে এমনভাবে অবস্থান করব। [ইবনে মাজাহ]

তিন. এতিম প্রতিপালনে হৃদয় নম্র হয় : আবু হুরায়রা [রা.] হতে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে তার অন্তর কঠিন মর্মে অভিযোগ করল। তিনি তাকে বললেন, যদি তুমি তোমার হৃদয় নরম করতে চাও তাহলে দরিদ্রকে খানা খাওয়াও এবং এতিমের মাথা মুছে দাও। [মুসনাদে আহমাদ: ২/৩৮৭]

চার. এতিম প্রতিপালন ও তাদের প্রতি সদয় হওয়ায় অত্যাধিক সওয়াব হাসিল হয় : আবু উমামা [রা.] হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো ছেলে অথবা মেয়ে এতিমের মাথায় একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে হাত বুলিয়ে দেয়, মাথার যত চুল দিয়ে তার হাতটি অতিক্রম করবে তার তত সওয়াব অর্জিত হবে। আর এতিমের প্রতি সে যদি ভাল ব্যবহার করে তাহলে এই দুই আঙ্গুলের ন্যায় সে এবং আমি জান্নাতে অবস্থান করব। রাসূলুল্লাহ তাঁর দুই আঙ্গুলকে মিলিয়ে দেখালেন। [মুসনাদে আহমদ]

এতিমের সম্পদ ভক্ষণকারীর শাস্তি
রাসুল [সা.] আরো বলেছেন, সাবধান! যদি এতিমের সম্পদ হস্তগত হয় তাহলে ওই সম্পদ ব্যবসার মাধ্যমে বৃদ্ধি করবে। এমন যেন না হয় যে জাকাত দিতে দিতে তার সম্পত্তি শেষ হয়ে যায়। এই মর্মে হজরত উমর [রা.] থেকেও একটি উদ্ধৃতি বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলেন, তোমরা এতিমের মাল ব্যবসার মাধ্যমে বৃদ্ধি করবে, যেন জাকাত তার সম্পদ নিঃশেষ করতে না পারে। একদা জনৈক ব্যক্তি রাসুলের [সা.] কাছে অভিযোগ করল হে আল্লাহর রাসুল, আমার হৃদয় অত্যন্ত পাষাণ হয়ে গেছে। তখন রাসুল [সা.] বললেন; এতিমের মাথায় হাত রাখ, মিসকিনদের আহার করাও। এতে অনেক পুণ্য রয়েছে। প্রতিটি চুলের বিনিময় নেকি দেয়া হবে।

এতিমের সম্পদে অবৈধ ক্ষমতা প্রয়োগকারীদের জন্য ভীষণ শাস্তির হুমকি রয়েছে, মহান আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় যারা এতিমদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে তারা তো তাদের পেটে আগুন খাচ্ছে, আর অচিরেই তারা প্রজ্জ্বলিত আগুনে প্রবেশ করবে। [সূরা নিসা : ১০] জাহেলি যুগে মানুষেরা এতিমদের ধন-সম্পদ থেকে উপকার হাসিলের মধ্যে সীমালঙ্ঘন করত। এমন কি সম্পদের লোভে কখনো বিয়ে করত অথবা সম্পদ যাতে হাত ছাড়া না হয়ে যায় সে জন্য নিজের ছেলেকে দিয়ে বিয়ে করাত এবং বিভিন্ন পন্থায় তাদের সম্পদ ভক্ষণের চেষ্টা করত। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদের ব্যাপারে উপরোক্ত আয়াতটি নাযিল করেন।

আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে ইবনে জারির রহ. বলেন, এতিমের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণকারী কিয়ামতের দিন এমতাবস্থায় উত্থিত হবে যে, তার পেটের ভিতর থেকে আগুনের লেলিহান শিখা মুখ, দুই কান, নাক ও দুইচক্ষু দিয়ে বের হতে থাকবে। যে তাকে দেখবে সে চিনতে পারবে যে, এ হচ্ছে এতিমের মাল ভক্ষণকারী। [ইবনে কাসীর]

এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন এক সম্প্রদায় নিজ নিজ কবর হতে এমতাবস্থায় উত্থিত হবে যে, তাদের মুখ থেকে আগুনের উদগীরণ প্রকাশিত হতে থাকবে। সাহাবায়ে কিরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এরা কারা? তিনি বললেন: তোমরা কি লক্ষ্য করনি যে, আল্লাহ তাআলা বলেন, যারা এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে তারা তাদের পেটে আগুন ছাড়া আর কিছুই ভক্ষণ করে না। [ইবনে কাসীর]

আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণনা করেছেন, যে রাতে আমাকে ভ্রমণ করানো হলো (অর্থাৎ ইসরার রাতে), সেথায় এমন এক সম্প্রদায়কে দেখলাম তাদের রয়েছে উটের ঠোটের ন্যায় ঠোট, যারা তাদের দায়িত্বে নিয়োজিত তারা ঐ লোকদের মুখের চোয়াল খুলে হা করাচ্ছে তারপর তাদের মুখ দিয়ে আগুনের পাথর ঢুকিয়ে দিচ্ছে, আর সাথে সাথে পাথরগুলি তাদের মলদ্বার দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমি জিবরাঈলকে বললাম, এরা করা ? তিনি বললেন: এরা হচ্ছে এতিমদের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণকারী । [ইবনে কাসীর]

সৌজন্যে : প্রিয়.কম


ফেসবুকে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। Gournadi.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে Gournadi.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো পোষ্ট...

Leave a Reply