মুক্তচিন্তা

পিয়াস করিম প্রসঙ্গ ধরে যৌনতা বিষয়ক কিছু কথা

সদ্য সমাহিত পিয়াস করিমের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার লক্ষ্যে প্রচার করা হয়েছে যে ভায়াগ্রা সেবনের ফলে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। আমি আমার আগের লেখায় বলেছি, হুমায়ূন আজাদের মৃত্যুর পর বলা হয়েছিলো যে মদ্যপানের ফলে তাঁর মৃত্যু ঘটেছে। আমি দেখিয়েছি, মরণোত্তর নিন্দা হচ্ছে বাঙালীর রাজনৈতিক সংস্কৃতির পশ্চাৎপদতা।

বক্ষ্যমান নৌটে আমার তর্ক হচ্ছেঃ পিয়াস করিম যদি ভায়াগ্রা সেবন করেও থাকেন, তাহলে নৈতিক সমস্যা কোথায়? ভায়াগ্রা যদি যৌনশক্তি বর্ধক ওষুধ হয়ে থাকে, আর যদি তিনি তা সেবন করে থাকেন, তাহলে আমাদের সমস্যা কী?

নিন্দুকদের অভিযোগ সত্য ধরে নিয়েই তর্ক করতে চাই। পিয়াস করিম ভায়াগ্রা সেবন করেছিলেন বলে এর প্রতিক্রিয়ায় যদি তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকে, তাতে তাঁর অপরাধের কী আছে? তিনি তো আত্মহত্যা করার জন্য ভায়গ্রা খাননি।

পিয়াস করিম যদি ভায়াগ্রা খেয়ে থাকেন, তাহলে নিশ্চয় তিনি যৌনসঙ্গম উপভোগ করার জন্য খেয়ে থাকবেন। এতে অনৈতিকতার বা লজ্জার কিছু নেই। আমি বরং সেজন্যে তাঁকে ধন্যবাদ দেবো। আমি বুঝবো তিনি যৌনসঙ্গমকে উপভোগ করার ব্যাপারে যত্নশীল ছিলেন।

যৌনতা নিয়ে, সঙ্গম নিয়ে, আমাদের এতো প্রেজুডিস কেনো? আমরা কি যৌনসঙ্গম করি না? আমরা কি আমাদের পিতা-মাতার যৌনসঙ্গমের ফল নই? আমাদের সন্তান-সন্ততিরা আমাদের যৌনসঙ্গমের পরিণতি নয়? গোটা মানবজাতি কি মানব-মানবীর যৌনসঙ্গমের উৎপাদন নয়?

সুস্বাদু খাদ্য ও স্বতঃস্ফূর্ত যৌনসঙ্গমের চেয়ে মানুষের জীবনে আনন্দতর আর কী আছে? কেনো আমরা ভান করি যে আমরা ভাজা মাছটি উল্টে খেতে পারি না?

আমার ধারণা, অধিকাংশ পুরুষ যৌনসঙ্গমের ব্যাপারে স্বার্থপর, আনাড়ি ও স্বৈরাচারী। আমি নারীবাদী বিভিন্ন লেখিকার লেখা পড়ে বুঝেছি যে, তাঁরা মনে করেন পুরুষদের যৌনানুভূতি শিশ্ন-ভিত্তিক। নারীর মতো সমগ্র দেহ যৌন-সংবেদনশীল নয়। আর তাই অধিকাংশ পুরুষ বস্তুতঃ যৌনসঙ্গমে স্বল্পায়ু ও সদা পরাস্ত।

যৌনসঙ্গমে পুরুষের এই পরাজিত মানসিকতাই তাঁদেরকে কৃত্রিমভাবে যৌনতা-বিরোধী করে তোলে। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ডিফেন্স মেকানিজম। এটি পুরুষ-মানসিকতার একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব। তাই সে একই সাথে কামুক ও রক্ষণশীল। নারীর শরীর আবৃত করতে পুরুষের যতো দাবী, নারীর ততো নয়। কারণ, পুরুষ ভীত – একদিকে হারবার ভয় ও অন্যদিকে হারাবার ভয়।

পুরুষ নিজের দুর্বলতা ঢাকতে সমগ্র যৌনতাকেই ষ্টিগমাটাইজ করে ট্যাবু তৈরি করে। তাই, মা ও মেয়ে যতো সহজে প্রজননতা তথা যৌনতা নিয়ে আলোচনা করতে পারেন, পিতা ও পুত্র তা পারেন না।

পুরুষ শাসিত সমাজে সৃষ্ট বিধি-বিধান পুরুষের পক্ষে যাবে, এটিই স্বাভাবিক। প্রতিটি ধর্মের অবতার পুরুষ হওয়ার কারণে ধর্মের বিধি-বিধানও পুরুষের যৌন-হীনমন্যতা ঢাকতে তৎপর, যদিও কোনো কোনো অবতার এ-বিষয়ে উৎসাহী ও যত্নশীল ছিলেন বলে পুরুষের যৌনসুখ বৃদ্ধি-কল্পে কিছু-কিছু পরামর্শও দিয়ে গিয়েছেন।

আমি তো মনে করি, প্রতিটি মানুষের উচিত উপযুক্ত বয়সে যৌনসঙ্গম উপভোগ করা। প্রতিটি পরিপূর্ণ মানুষের উচিত যৌনসঙ্গমকে শিল্পের ও ক্রীড়ার নিপুনতায় রপ্ত করা। মানুষের উচিত তাঁর পাওয়া একটি মাত্র জীবনের সীমিত সময়ের মধ্যে যতোদিন পারে, ততোদিন যৌনসঙ্গমের মাধ্যমে দেহের সুখ অনুভব করা।

মানব জাতির এহেন সুখের বিষয়কে কারা কবে কালিমালিপ্ত করেছে, সেটি গবেষণার বিষয়। তবে, এই অঞ্চলে একসময়ে যৌনসঙ্গমের কলাকে যে শিক্ষণীয় মনে করা হতো, তার সম্ভাব্য উজ্জ্বলতম প্রমাণ মেলে উড়িষ্যার কোনার্ক সূর্যমন্দিরে। কোনার্ক সূর্যমন্দিরে নর-নারীর যৌনসঙ্গমের চমৎকার সমস্ত ভঙ্গির ভাষ্কর্য করা আছে। এ-সমস্ত ভঙ্গি অতি শিল্পময় ক্রীড়ানৈপুন্যমণ্ডিত।

যৌনসঙ্গম একটি মহান মানবিক কর্ম। এটি মানব সভ্যতার ধারক। সুখের উৎস। আনন্দের উৎস। পৃথিবীতে একমাত্র যৌনসঙ্গমই সাম্যবাদী সুখ, যা কোনো বাড়তি উপকরণ ছাড়াই স্বাভাবিক মানুষের অতিগুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় প্রবৃত্তি তৃপ্ত করতে পারে।

যৌনসঙ্গম সংজ্ঞানুসারে অস্বার্থপর। এটি খাদ্যের চেয়ে মহত্তর। খাদ্য একক-ভোগ্য, কিন্তু যৌনসঙ্গম যুগল-ভোগ্য। স্বাভাবিক যৌনসঙ্গম প্রকৃতিগভাবেই সহযোগিতামূলক এবং সৃষ্টিশীল। যৌনসঙ্গম যা সৃষ্টি করতে পারে, অন্য কোনো মানবিক ক্রিয়া তার চেয়ে মহান কিছু সৃষ্টি করতে পারে না। আমরা জানি, সেই সৃষ্টির নাম জীবন। মানব জাতির অস্তিত্বের জন্য এখনও পর্যন্ত যৌনসঙ্গম অপরিহার্য।

সুতরাং প্রতিটি উপযুক্ত মানব-মানবীর উচিত যৌনসঙ্গমকে উন্নত শিল্পবোধে ও সৌন্দর্যবোধে পরম উপভোগ্য রূপে তাঁর সঙ্গী বা সঙ্গিনীর সাথে আনন্দ ও সুখ সহভাগের উদ্দেশে যত্নের সাথে উপভোগ করা। বাঙালীর উচিত হবে যৌনসঙ্গমের ধারণা, আবেগ ও চর্চার ব্যাপারে হীনমন্যতা থেকে মুক্ত হওয়া।

লিখেছেন : মাসুদ রানা
শনিবার ১৮ অক্টোবর ২০১৪

নিউবারী পার্ক, এসেক্স, ইংল্যাণ্ড


ফেসবুকে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। Gournadi.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে Gournadi.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো পোষ্ট...

Leave a Reply

Check Also

Close