মুক্তচিন্তা

ধর্ম বনাম উৎসব: ফরহাদ মাজহার

‘কোরবানি’ একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান, এটা সেকুলার অর্থে ধর্মভাবহীন কোনো ‘উৎসব’ নয়। ধর্মীয় অনুষ্ঠান বলার অর্থ হচ্ছে, আনুষ্ঠানিকতা ও বৈষয়িকতা এর বাহ্যিক বা বাইরের দিক; প্রধান উদ্দেশ্য আত্মিক বা আধ্যাত্মিক উদবোধন বা বোধন। এই উদযাপনকে নানা দিক থেকে ব্যাখ্যা করা যায়। নৃতত্ত্ববিদরা যা অনেক সময় করে থাকেন। সে যাই হোক, সেকুলার যুগে আত্মা, আত্মিকতা, আধ্যাত্মিকতা ইত্যাদি নিয়ে কথা বলা দার্শনিকদের জন্য বিশাল এক মুসিবতের কারণ হয়ে পড়ে। মুশকিলটা সেকুলার ও ধার্মিক দুই দিক থেকেই আসে। সেকুলাররা ধর্ম নিয়ে যখন কথা বলেন, তখন তার ভাবগত দিকের গুরুত্ব মানেন না, আর ধার্মিকরা ধর্মের দার্শনিক আলোচনাকে ঈমান আকিদার দিক থেকে বাড়তি আপদ গণ্য করেন। ধর্ম পালনই ধর্ম। ধর্মের অন্তর্গত চিন্তার ব্যাখ্যা অনেক সময় বদ্ধমূল মত ও প্রথাকে ধর্মের ভেতর থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। ধর্মতত্ত্ববিদদের জন্য তা অস্বস্তির কারণ ঘটাতে পারে।

সেকুলার যুগে ধর্মকে বৈষয়িকতা থেকে কিংবা বৈষয়িকতাকে ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন জ্ঞান করে কথা বলা হয়। ধর্ম আমরা ইহলোকেই পালন করি, যদিও এটা ধরে নেয়া হয় যে, ধর্ম একান্তই একটি পারলৌকিক ব্যাপার। ইহলৌকিক চর্চা হিসেবে যে কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা ও বৈষয়িকতা রয়েছে। কোরবানির একটা আনুষ্ঠানিকতা আছে, আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের জন্য প্রাণীকে উৎসর্গ করার ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক বিধিবিধান। তেমনি পশুরও বৈষয়িকতা আছে। গরু, ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা কেউই কাল্পনিক বস্তু নয়। ইহলোকেই তাদের সংগ্রহ ও নির্বাচন করতে হয়। পশুর অর্থনীতি আছে। আর বাংলাদেশে আমরা জানি, এর সঙ্গে গভীর আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য ও জটিল রাষ্ট্রীয় সম্পর্কও রয়েছে। প্রচুর গরু ভারত থেকে আসে। বলা হয়, ভারতীয়রা ধর্মীয় কারণে গরু বধ করে না বলে গরুসকল চালান হয়ে বাংলাদেশে আসে। আর এখানে তারা কোরবানিতে জবাই হয়ে মুসলমানের ধর্ম পালনের উপায় হয়। হিন্দুর গরু সীমান্ত অতিক্রম করে মুসলমানের কোরবানির পশুতে পরিণত হয়। এই বাণিজ্যের বিরুদ্ধে ভারতীয় হিন্দু ভয়ংকরভাবে প্রতিবাদী হয়েছেন বা আপত্তি করেছেন বলে শুনিনি বা জানি না; কিংবা হিন্দুর গরু বলে মুসলমান তাকে জবাই করবে না, এমন ফতোয়া কেউ বাংলাদেশে দিয়েছেন বলে জানি না। ধর্মের আনুষ্ঠানিকতা বা বৈষয়িকতাকে তাহলে বাজার ব্যবস্থার বাইরে এ যুগে বিচার করা অর্থহীন।

অন্যদিকে বৈষয়িকতার সঙ্গে আমাদের দৈনন্দিন সম্পর্কের কোনো আধ্যাত্মিক চরিত্র নাই- এটাও ভুয়া দাবি। ওপরে ধর্মের আনুষ্ঠানিকতা ও বৈষয়িকতার দিকটা আমরা যত সহজে বোঝাতে পেরেছি, বস্তু জগৎ বা ইহলৌকিক জগতের সঙ্গে মানুষ মাত্রেরই সম্পর্ক ‘আধ্যাত্মিক’ এই দিকটা বোঝানো তুলনামূলকভাবে কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয় মোটেও। এতটুকু যদি বুঝি যে জগতের সঙ্গে আমি কীভাবে সম্পর্কিত হব, সেটা পূর্বনির্ধারিত কিছু নয়, সেটা আমার মন বা আত্মারও ব্যাপার, তাহলে আমার আত্মা বা মন যা নির্ণয় করে, তাকে নিছক আনুষ্ঠানিক বা বৈষয়িক জ্ঞান করার কোনো যুক্তি নাই। সেটা আত্মাবিষয়ক বা আধ্যাত্মিক ব্যাপারও বটে। হতে পারে সেটা প্রথাগত, প্রাচীন বা প্রচলিত ধর্ম নির্ধারণ করে দিচ্ছে না। কিন্তু সেটা আধ্যাত্মিক নয় এই দাবিও ভুল।

একটা উদাহরণ দিচ্ছি। জগৎ মানুষের সামনে শুধু ভোগের জন্য হাজির, আর মানুষ মাত্রই খাদক- এই দাবি কোনো সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়, আধ্যাত্মিক অনুমান বা বিশ্বাস মাত্র। কিন্তু আধুনিক বা সেকুলার সমাজের ভিত্তিটাই এই অনুমান বা বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। পাশ্চাত্যের ‘স্পিরিট’ বা ‘স্পিরিচুয়াল’ কথাটার অনুবাদ আমরা করি আধ্যাত্মিক- এই অনুবাদ সংকীর্ণ; এতে মনে হয় ‘স্পিরিট’ নিয়ে কথা বলার মানে ধর্মতাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে কথা বলা; ধর্মের সঙ্গে বস্তুজগতের বিশেষ সম্পর্ক নাই। অতএব ইহলৌকিক প্রসঙ্গ স্পিরিচুয়াল বা আধ্যাত্মিক আলোচনায় পরিত্যাজ্য। তারা ভিন্ন বিষয়।

অথচ পাশ্চাত্য দর্শনে ‘স্পিরিট’ বা ‘স্পিরিচুয়াল’ কথাটার মানে স্রেফ ধর্মতাত্ত্বিক অর্থে স্পিরিচুয়াল কিছু নয়। ইহলৌকিকতার মধ্যে মানুষের মন নিজেকে ও জগৎকে কীভাবে জানে, কীভাবে সম্পর্কিত হয়, কীভাবে ধর্ম, সংস্কৃতি, নৈতিকতা, রাষ্ট্র ইত্যাদি গড়ে তোলে সেই অর্থে স্পিরিটের কারবারের কথা বলা হয়। এর ভালো একটি উদাহরণ হচ্ছে কার্ল মার্কসের গুরু হেগেল। তার ‘ফেনোমেনলজি অফ দ্য স্পিরিট’ কোনো আধ্যাত্মিকতা বিষয়ক বই নয়। মানুষের জ্ঞানস্পৃহা, ইচ্ছা, নৈতিকতা ও সংকল্প কীভাবে নিজের স্বভাবগুণে বিকশিত হয় সেটাই তিনি এ বইয়ে দেখাতে চেষ্টা করেছেন। দেখা যাচ্ছে স্পিরিট বা স্পিরিচুয়াল কথাগুলোর পরিভাষা নির্মাণের ক্ষেত্রে আমরা যেভাবে ‘আত্মা’, ‘আধ্যাত্মিকতা’ ইত্যাদি অনুবাদ গ্রহণ করি এবং আমাদের চিন্তার ব্যাকরণে নিত্য নির্বিচারে ব্যবহার করছি, তার ফলে ধর্ম, সমাজ ও ইতিহাস নিয়ে পরিচ্ছন্ন আলোচনা-পর্যালোচনা বেশ কঠিন ব্যাপার হয়ে উঠেছে। এখানে পত্রিকার কলামে এই গুরুত্বপূর্ণ অথচ জটিল বিষয় অল্পকথায় বুঝিয়ে বলা কঠিন। তবে আশা করি বোঝা কঠিন নয় যে, জগৎ বা প্রকৃতি মানুষের ভোগ বা খাদ্য হওয়ার জন্য সৃষ্টি হয়েছে আর মানুষ মানেই ভোগী ও খাদক এটা একান্তই একটি আধ্যাত্মিক বিশ্বাস ও অনুমান। একে মেনে নেয়া নিজেকে আধ্যাত্মিক জগতে নিক্ষিপ্ত করে রাখার মতোই ব্যাপার। জগৎ মায়া কিংবা পরকালই শুধু সত্য, ইহলোক মিথ্যা- এই দাবি ঠিক যে অর্থে আধ্যাত্মিক, ঠিক একইভাবে মানুষের পরমার্থ তার ভোগী জীবনে- জগতের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শুধু খাদ্য/খাদকের সম্পর্ক এই অনুমানও সমান আধ্যাত্মিক।

দুই
কোরবানি নিয়ে ভাবতে গিয়ে সেকুলার যুগে আত্মা, আধ্যাত্মিকতা, আধ্যাত্মিকতা ইতাদি নিয়ে কথা বলা দার্শনিকদের জন্য বিশাল এক মুসিবত- এটা সূচনাতেই মেনে নিতে হচ্ছে। বলার বাস্তবিক কারণ রয়েছে। কোরবানির বিরুদ্ধে বেশ কয়েক বছর ধরে অনেকের কাছ থেকে আপত্তি শুনি। এদের সবাই ধর্মবিরোধী বা সেকুলার নন মোটেও। বরং যেভাবে কোরবানিকে তার ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক তাৎপর্য থেকে বিচ্যুত করে একে নিছকই পশু জবাই করার ব্যাপারে পরিণত করা হচ্ছে, তাতে তারা উদ্বিগ্ন। আর একে নজির হিসেবে গণ্য করে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে যে নেতিবাচক প্রচারণা বিশ্বব্যাপী চালানো হয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের এই কালে, তা রাজনৈতিক দিক থেকে বিপজ্জনক। ফলে একে উপেক্ষা করা কঠিন।

তাহলে এই উদ্বিগ্নতা বা উৎকণ্ঠা নিরসন করতে হলে কোরবানির আধাত্মিক তাৎপর্য কী- এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দরকার আছে। এখানে সেই তাৎপর্যের হদিস দেয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। যারা ধর্মবিদ এবং এসব বিষয়ে কথা বলার অধিকারী, তারা সেটা নিশ্চয় করবেন। এবং করছেনও। ধর্মতত্ত্বের দিক থেকে হজরত ইব্রাহীম (আ.) নিঃশর্তে আল্লাহর আদেশ মানছেন। তাঁর নিজের ইচ্ছা, ভালোবাসা, মমতা, পারিবারিক সম্পর্ক ও রক্তের বন্ধন সব আল্লাহর প্রতি তাঁর আনুগত্যের তুলনায় তুচ্ছ। সবকিছুর ঊর্ধ্বে আল্লাহর আদেশ- এই সত্য প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়ে তিনি যেমন ইসলামে অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে নিয়েছেন, তেমনি ইসলাম এই সত্যকে জারি রাখার জন্য প্রিয় সন্তানকে আল্লাহর হুকুমে কোরবানি দেয়ার মুহূর্তটি বারবার মনে করিয়ে দিতে আগ্রহী। মনে করিয়ে দেয়ার মানে এটা নয় যে, প্রতিটি পরিবারকে একটি করে পশু কোরবানি দিতে হবে। এমনকি কোরবানি ওয়াজিব নাকি সুন্নত এই তর্কও তো বিভিন্ন মাজহাবের মধ্যে রয়েছে। বলা হয় আখেরি নবী বনি হাশেম গোত্রের জন্য একটি মাত্র দুম্বা কোরবানি দিতেন।

কিন্তু সেসব ভিন্ন তর্ক। ইসলামের কাছে মূল প্রশ্ন হচ্ছে, আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য। কিন্তু সেটা পরীক্ষা মাত্র। কারণ হজরত ইব্রাহীম (আ.) ইসমাইলকে কোরবানি দেননি। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ায় তাঁরই আদেশে একটি দুম্বা কোরবানি করেছেন।

মূল কথা হচ্ছে, কোরবানি মাংস খাওয়ার ‘উৎসব’ নয়, এটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান। তাহলে যে কাজ ধর্মভাবের স্ফুরণ ঘটায় না, কিন্তু ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে নিছকই ‘উৎসব’ জ্ঞান করে পশু বধে পর্যবসিত হয়, সেটা যে কোনো ধর্মপ্রাণ মানুষকে ব্যথিত করে, সন্দেহ নাই। এটা তো মিথ্যা নয়, ভোগীর কাছে কোরবানি আসলে মাংস খাওয়ার উৎসবের অধিক কিছু নয়। কোরবানির মাংস বিলিয়ে না দিয়ে যেভাবে ফ্রিজে ফ্রিজে দীর্ঘ সময় রাখা হয়- নিজের ভোগের জন্য- তাকে ‘ধর্মীয়’ ভাবা খুবই কঠিন বৈকি। এতে ফ্রিজ কোম্পানির ব্যবসাও বেড়েছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান কেন নিছক উৎসবে পর্যবসিত হল, তার কারণ অর্থনীতি ও সমাজের রূপান্তর। বাজার থেকে পশু কিনে এনে তাকে ‘প্রিয় বস্তু’ হিসেবে কোরবানি দেয়ার মধ্যে ধর্মের মহিমা কতটুকু কায়েম হয়, সেটা ধর্মতাত্ত্বিকরা ভালো বুঝবেন। আমি এ বিষয়ে আলোচনার অধিকারী নই, তবে বুঝতে পারি বাজার ব্যবস্থা ধর্মের যে রূপান্তর ঘটিয়েছে ও ঘটাচ্ছে, ধর্মতত্ত্ব তাকে প্রতিরোধ করার সামর্থ্য বিশেষ রাখে না। উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার কারণ এখানেই।

ধর্মের তাহলে সমাজতত্ত্ব আছে। তার অর্থনীতিও আছে। ঈমান আকিদার দিক ধর্ম পালন আর সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও দর্শনের জায়গা থেকে ধর্মের বিচার আলাদা। কোনো ধর্মকেই বিচ্ছিন্নভাবে পাঠ করা যায় না। বোঝাও যায় না। যে ঐতিহাসিক বাস্তবতায় ইসলামে কোরবানির প্রচলন হয়েছে, তাকেও বাস্তব ইতিহাস হিসেবে বোঝার দরকার আছে। বোঝার দরকার আছে সব দিক থেকেই।

বাংলাদেশে সেই হিম্মত গড়ে উঠুক। এই ঈদে সেই প্রত্যাশা জানিয়ে সবাইকে শুভেচ্ছা।

(এই পোষ্টটি দৈনিক যুগান্তরে প্রথম প্রকাশিত হয়েছে)


ফেসবুকে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। Gournadi.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে Gournadi.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

Tags

আরো পোষ্ট...

Check Also

Close