গৌরনদী সংবাদ

গৌরনদী থানায় আড়াই বছরে ৪ ওসি ক্লোজড!

গত আড়াই বছরে বরিশালের গৌরনদী মডেল থানার চার জন ওসিকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করা হয়েছে।

অনিয়ম-দুর্নীতি ও দায়িত্ব অবহেলাসহ নানাবিধ অভিযোগের প্রেক্ষিতে ওই ৪ ওসিকে ক্লোজড করে বরিশাল জেলা পুলিশ সুপার ও ডিআইজি কার্যালয়ে এবং বরিশাল পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়। গৌরনদী থানা ও জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের একটি সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

ওসি মো. সাজ্জাদ হোসেনঃ আগৈলঝাড়া থানা থেকে ২০১৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর গৌরনদী থানায় ওসি হিসেবে যোগদান করেন। দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে ২০১৫ সালের ১৬ জুলাই দুপুরে গৌরনদী মডেল থানার ওসি মো. সাজ্জাদ হোসেনকে বরিশাল পুলিশ লাইন্সে ক্লোজড করা হয়।

দীর্ঘদিন বরিশাল পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত থাকার পর ২০১৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বানারীপাড়া থানায় ওসি হিসেবে যোগদান করেন।

বরিশাল রেঞ্জের তৎকালিন ডিআইজি মো. হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের জানিয়েছিলন, ওই বছর ঈদুল ফিতর উপলক্ষে মানুষ নিরাপদে ঘরে ফিরবে বলে মহাসড়ক যানজট মুক্ত রাখতে জেলা পুলিশকে আগেভাগেই সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো। অথচ ২০১৫ সালের ১৬ জুলাই বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দক্ষিণাঞ্চলের সাথে সড়কপথে যোগাযোগের একমাত্র ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের গৌরনদী উপজেলার নিলখোলা নামক স্থানে বিআরটিসির একটি বাস দুর্ঘটনায় মহাসড়কের উপরে পড়ে থাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

এতে প্রায় একঘন্টা মহাসড়কের দু’পার্শ্বে শতশত যানবাহন আটকা পড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টির ফলে ঈদুল ফিতরে দক্ষিণাঞ্চলের হাজার হাজার যাত্রী চরম দুর্ভোগের শিকার হন। দীর্ঘসময়ে যানজট নিরসনে গৌরনদী থানা পুলিশ কোন উদ্যোগই গ্রহণ করেনি।

খবর পেয়ে তিনি (ডিআইজি) বরিশাল থেকে ঘটনাস্থলে গেলেও সেখানে কোন থানা পুলিশ উপস্থিত ছিলেন না। এজন্য দায়িত্ব অবহেলার কারণে তার (ডিআইজির) নির্দেশে বরিশাল জেলার তৎকালিন পুলিশ সুপার এস.এম আক্তারুজ্জামান ওইদিনই (১৬ জুলাই) গৌরনদী থানার ওসি সাজ্জাদ হোসেনকে পুলিশ লাইন্সে ক্লোজড করেন।

তবে সাধারণ জনগন মনে করেন, বরিশাল রেঞ্জের তৎকালিন ডিআইজি মো. হুমায়ুন কবিরের ব্যক্তিগত রোষানলে ওসি সাজ্জাদকে ক্লোজড করা হয়েছিল।

ওসি আলাউদ্দিন মিলনঃ গৌরনদী থানায় ২০১৫ সালের ১০ আগস্ট যোগদান করেন। ২০১৭ সালের ২৯ মার্চ রাতে বিপুল পরিমান ইয়াবাসহ গৌরনদীর কটকস্থল গ্রামের মাদক বিক্রেতা হীরা মাঝিসহ ৩ মাদক বিক্রেতাকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। এ সময় মাদক বিক্রেতাদের সাথে সখ্যতার অভিযোগ উঠার প্রেক্ষিতে ৩০ মার্চ ওসি আলাউদ্দিন মিলনকে ক্লোজড করে বরিশাল ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত করে হয়।

তখন বরিশাল জেলার তৎকালিন পুলিশ সুপার এস.এম আক্তারুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। দীর্ঘদিন ডিআইজি অফিসে সংযুক্ত থাকার পর ওসি আলাউদ্দিন মিলনকে ২০১৭ সালের ১৬ অক্টোবর কলাপাড়া থানায় ওসি হিসেবে যোগদান করেন।

ওসি ফিরোজ কবিরঃ ২০১৭ সালের ১ এপ্রিল গৌরনদী মডেল থানার ওসি হিসেবে যোগদান করেছিলেন। যোগদানের পর সে মাদক বিরোধী সভা-সমাবেশ করে মাদকের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন। এরপর তিনি মাদক বিরোধী অভিযান ও মাদক নির্মূলের কাজ শুরু করেন। এপ্রিল মাসে সে মাদক নির্মূলে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন। যোগদানের একমাস পর মাদক বিরোধী অভিযান ও মাদক নির্মূলের অন্তরালে ওসি মো. ফিরোজ কবিরের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য ও ব্যাপক চাঁদাবাজির মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছিল।

তখন উপজেলার ইল্লা গ্রামের নির্যাতিত প্রবাসী মনির সরদারের বাবা মোসলেম সরদার, খাঞ্জাপুর ইউনিয়ন আ’লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক ইউপি সদস্য আরজ আলী সরদার, উপজেলার দিয়াসুর গ্রামের ব্যবসায়ী ছবেদ আলীসহ কয়েকজন ভূক্তভোগী পুলিশ সদর দপ্তরে ও জেলা পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।

বরিশাল জেলার তৎকালীন পুলিশ সুপার এস.এম আক্তারুজ্জামান বলেছিলেন, নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে যোগদানের ৪ মাসের মাথায় ৩১ জুলাই ওসি ফিরোজ কবিরকে গৌরনদী থানা থেকে ক্লোজড করে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়।

তখন ওসি ফিরোজ কবির অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন দাবি করে বলেছিলেন, আমাকে উর্ধতন কর্তৃপক্ষ বরিশাল পুলিশ অফিসে যুক্ত করেছে। তবে কোন অভিযোগের ভিত্তিতে নয়।

পুনশ্চঃ ওসি ফিরোজ কবির ছিলেন মাদক ব্যবসায়ী ও মাদক সেবনকারীদের আতঙ্ক। এছাড়া অত্র অঞ্চলের সাধারণ জনগন এখনও ওসি ফিরোজকে মনে করেন এবং যদি সম্ভব হয় তাকে ফিরিয়ে আনার দাবী জানান।

ওসি মনিরুল ইসলামঃ ২০১৭ সালের ১ আগস্ট আগৈলঝাড়া থানার ওসি মো. মনিরুল ইসলামকে গৌরনদী থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়। উপজেলার পালরদী মডেল স্কুল এন্ড কলেজের ছাত্র ও ছাত্রলীগকর্মী সাকির গোমস্তা হত্যা মামলার এজাহারভূক্ত আসামি ফাহিমকে গ্রেফতারের পর থানা থেকে ছেড়ে দেয়ার অভিযোগ প্রমানিত হওয়ায় ওসি মনিরুল ইসলামকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করা হয়েছে।

তিন সদস্যে’র তদন্ত কমিটি অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রতিবেদন দাখিল করার পর ওসি মনিরুলকে ২৬ জানুয়ারি রাতে গৌরনদী থানা থেকে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। আসামি ছেড়ে দেয়াসহ নানাবিধ অভিযোগের ভিত্তিতে যোগদানের ৫ মাস ২৫ দিন পর চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি ওসি মনিরুলকে ক্লোজড করা হয়।

বরিশাল জেলা পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, আসামি ছেড়ে দেয়ার অভিযোগে গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে ওসি মনিরুল ইসলামকে ২৬ জানুয়ারি রাতে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।

এছাড়া ওসি মনিরুল গৌরনদী থানায় যোগদান করার পর মাদক নির্মূলসহ বিভিন্ন কর্মকান্ডে অযোগ্যতার প্রমাণ দেয়ায় তার বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়। আমার (এসপি) বরিশালে যোগদানের পূর্বে গৌরনদী থানার ৩ ওসি কি কারণে ক্লোজড হয়েছে তা আমার জানা নেই।

বর্তমানে ইন্সপেক্টর ফিরোজ কবির ও ইন্সপেক্টর মনিরুল ইসলাম জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সংযুক্ত রয়েছে বলে পুলিশ সুপার সাইফুল জানান।


ফেসবুকে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। Gournadi.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে Gournadi.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

আরো পোষ্ট...