দিল্লির লালকেল্লা লাল নয়, ছিল সাদা! জানুন এমন আরও না জানা কথা

দিল্লী ভ্রমণ মানেই লাল দূর্গে একবার অন্তত যেতেই হবে। মোগল স্থাপনার এই অনন্য নিদর্শন নিজের চোখে না দেখলেই নয়। আর একটি স্থাপনা শুধু পাথরের দেয়াল নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে অযান্ত্রিক যুগের মেধা আর শিল্পমনের পরিচয়, জড়িয়ে আছে সেই সময়ের শাসকের গল্প, শ্রমিকের গল্প, জীবনের গল্প। তাই সময়কে যারা জানতে চান তারা বার বারই ছুটে যান প্রাচীন স্থাপত্যের কাছে।

১৬৩৯ সালে যখন শাহ জাহান তার রাজধানী আগ্রা থেকে নিয়ে আসেন দিল্লীতে তখন তিনি এই দূর্গ নির্মাণের নির্দেশ দেন। তখন এই স্থানের নাম ছিল শাহজাহানাবাদ, বর্তমানে জায়গাটিকে আমরা পুরাতন দিল্লী হিসেবে চিনি। এর নির্মাণে সময় লেগেছিল এক দশক। যমুনা নদীর পানি দিয়ে পূর্ণ করা হত এর পরিখাগুলো। এখন সেই নদী আর নেই। সেই সময়ের গল্প আজও বিস্ময় জাগায়, অনেক কিছুই যেন বিশ্বাস হতে চায় না, অনেক প্রশ্নের উত্তর আজও মেলে না।
বেড়াতে যাওয়ার আগে জেনে নিন মজার কিছু তথ্য। আপনি সরসরি ভ্রমণেও অনেক কিছুই হয়ত মিস করে যাবেন। প্রচলিত ইতিহাসের পেছনেও আছে অনেক গল্প, অনেক কথা যা ইতিহাস আপনাকে জানাতে চায়। জানুন, এরপর দেখুন। ভ্রমণ হবে আরও উপভোগ্য।

তুলে ধরছি এমন কিছু মজার তথ্য-

রং মহল। ছবি- সংগৃহীত

লাল দূর্গ প্রকৃতপক্ষে ছিল সাদা

দূর্গটির নাম লাল আবার দেখতেও সবার আগে চোখে পড়ে এর লাল ইট রঙ্গা দেয়াল। কিন্তু দূর্গটি মোটেই এভাবে নির্মিত হয় নি। ইন্ডিয়ার নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় পাওয়া তথ্যমতে, দালানের বিভিন্ন অংশে ব্যবহার করা হয়েছিল চুনাপাথর। তাই শ্বেতবর্ণই ছিল এর প্রকৃত বর্ণ। কিন্তু একসময় এর শুভ্রতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এর উজ্জ্বলতা মলিন হয়ে এলে বৃটিশরা দুর্গের দেয়ালে লাল রং করে দেয়।

লাল কেল্লার প্রকৃত নাম লাল কেল্লা নয়

উঁচু লাল দেয়াল যা ঘিরে আছে দূর্গটিকে তার রঙই দিনে দিনে মানুষের মুখে মুখে এর নাম দেয় লাল কেল্লা। দেয়ালটি নির্মিত হয়েছিল লাল পাথর আর ইট দিয়ে। ব্রিটিশরা দূর্গটিকে ডাকতে শুরু করে ‘রেড ফোর্ট’ আর স্থানীয়রা ডাকে ‘লাল কেল্লা’। কিন্তু এর প্রকৃত নাম ছিল ক্বিলা-ই-মুবারাক।

স্থাপত্যশিল্পী

বিশাল এই কেল্লাটির স্থাপত্যশিল্পীদের নাম নিশ্চয়ই জানতে চাইবেন আপনি? আজকে যা দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হচ্ছেন আপনি তার নকশা করেছিলেন ওস্তাদ হামিদ এবং ওস্তাদ আহমেদ।

কোহিনূর ছিল এখানেই

শাহজাহানের সিংহাসনে স্থান পেয়েছিল কোহিনূর একথা জানি আমরা সবাই। সেই সিংহাসন ছিল লাল কেল্লায়। পুরো আসনটিই ছিল খাটি সোনার, খচিত ছিল নানান মূল্যবান রত্নে। দেওয়ান-ই-খাস এ রাখা ছিল সিংহাসনটি। সিংহাসনের শীর্ষে শোভা পেত বিশ্বের সবচেয়ে বড় হিরাটি।

লাহোর গেট

লাল কেল্লার দুইটি প্রধান পথ। একটি দিল্লী গেট আর অন্যটি লাহোর গেট। ২য় পথটির নাম লাহোর গেট কারণ লাহোরের সাথে এর সংযোগ রয়েছে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, ইন্ডিয়া আর পাকিস্তান এক সময় একই দেশ ছিল।

একটা ওয়াটার গেটও আছে এখানে
৩য় একটি বহির্গমণ পথ আছে দূর্গটির। যমুনা নদীর তীরেই ছিল কেল্লাটি। নদীর সাথে সহজ সংযোগ রাখতেই তৈরি হয়েছিল এই গেটটি। নদী যদিও এখন আর কাছে নেই, তবে আছে নামটি।

বার্ডস আই ভিউতে দূর্গটি দেখতে ছিল এরকম। ছবি- সংগৃহীত

দূর্গটি অষ্টকোণী
বার্ডস আই ভিউ থেকে চমৎকার এই স্থাপনাটি দেখতে অষ্টকোনী। ২৫৬ একর জায়গা জুড়ে এর বিস্তৃতি। লাল প্রাচীরের বেষ্টনীটি উপর থেকে দেখতে একটি পারফেক্ট অষ্টভূজ।

রং মহল
রং মহল বাস্তবেই ছিল রঙের প্রাসাদ। এখানে বাস করতেন সম্রাটের পত্নী, উপপত্নী এবং দাসীগণ। পাশের খাস মহলেই থাকতেন সম্রাট যাতে যে কোনো সময় আসতে পারেন রং মহলে। রাতের খাবার বা হালকা নাস্তা করতে এখানেই আসতেন তিনি। সম্রাট ছাড়া অন্য কারও মহলে প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ।

নাক্কারখানা
কেল্লার সঙ্গীতের আসর বসত এখানে। প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে বসত সেই আসর। প্রাসাদের সম্মুখেই অবস্থিত এই জায়গাটি। অভিজাত ব্যক্তিরা এখানে গান শুনতে আসতেন হাতির পিঠে চড়ে।

সুরক্ষা ব্যবস্থা
কেল্লাটিকে ঘিরে আছে একটি বিশাল পরিখা। এর পানি আসত যমুনা নদী থেকে। কেল্লার নিরাপত্তার স্বার্থে পরিখায় রাখা হত কুমির। কোনভাবে শত্রুপক্ষের কেউ যদি কুমিরের এই পরিখা পার হয়েও যেত তার জন্য কেল্লার গায়ে মাখানো থাকত তেল। যতই চেষ্টা করুক না কেন কুমিরের খাদ্য হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকত না তার।

বাহাদূর শাহ বন্দী ছিলেন এখানে
শাহ জাফর তখন দিল্লীর সম্রাট। বাহাদূর তার উপাধি। কিন্তু ভূখন্ড চলে গেছে ব্রিটিশদের দখলে। দেওয়ানি খাসের সামনে ব্রিটিশ কোর্ট বসে। সম্রাটকে রাজদ্রোহী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত করা হয় সেই কোর্টে! তার উপাধি কেড়ে নেওয়া হয়। পরে তাকে নির্বাসন দেওয়া হয় বর্তমান মায়ানমারে।

কেল্লার সকল মূল্যবান বস্তু চুরি করে ব্রিটিশরা
মোগল শাসনের শেষ সময়ে ব্রিটিশরা কেল্লার দখল নেয়। তারা এর মূল্যবান সকল আসবাব, পাথর, রত্ন বিক্রী করে দেয়। স্থাপত্যের গায়ে খচিত রত্ন বিক্রী করার জন্য তারা স্থাপত্যের দেয়ালের প্রচুর ক্ষতি সাধন করে। আর এজন্যই আপনি আজ যে কেল্লা দেখতে পাবেন তাতে সেই রত্নশোভা আর নেই।

এটি বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ
ইউনেস্কো লাল কেল্লাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা করে ২০০৭ সালে।

জ্ঞান আমাদের মনকে বড় করে। আপনি যত দেখবেন তত বদলে যাবে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি। তাই দেখুন, জানুন। ভ্রমণ করুন, নতুন থেকে নতুনের কাছে যান। সৃষ্টি তা প্রকৃতির হোক আর মানুষের, তার রহস্য মুগ্ধ করবে আপনাকে।


ফেসবুকে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। Gournadi.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে Gournadi.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

শেয়ারঃ

মন্তব্য করুন