গৌরনদী সংবাদফিচার

স্মৃতিচারণে শাহানারা আব্দুল্লাহ: ও রাজত্ব এনেছিল চলেও গেল বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে

সূর্যের কিরণ তখনো চারপাশ আলোকিত করেনি। ফজরের আযানের সুরেলা ধ্বনি চারিদিক থেকে সুধা ঢালছে। এমনই সময় অতর্কিত হামলায় কেঁপে উঠলো রাজধানীর ২৭নং মিন্টো রোডের বাড়িটি। যা বর্তমানে ঢাকা মহানগর পুলিশের সদরদপ্তর। ঘাতকের আগমনে ভীত চার বছরের শিশু সুকান্ত বাবু আশ্রয় চাইলেন মা শাহানারা আব্দুল্লাহর কোলে। কিন্তু গৃহকর্ত্রীর কোলে তখন তার ছোট ছেলে। ঘাতকদের তপ্ত বুলেটে মায়ের চোখের সামনে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো সুকান্ত।

অশ্রুস্বজল চোখ আর বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে শাহানারা আব্দুল্লাহ বললেন, ‘আমার কোলে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু কোলে নিতে পারি নাই। চোখের সামনে সন্তানের নাক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। নির্মম মুত্যু দেখি। কিন্তু কিছুই করতে পারি নাই।’

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালো রাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে হামলার পাশাপাশি তার ভগ্নিপতি ও তৎকালীন পানিসম্পদ মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাড়িতেও হামলা করে ঘাতক দল। সেখানে আব্দুর রব সেরনিয়াবাতসহ ৭ জন নিহত হন। এর মধ্যে ৪ বছরের শিশু সুকান্ত বাবুও ছিল।

১৫ আগস্টের কালো রাতের ৪০তম বার্ষিকীকে সামনে রেখে ১১ আগস্ট বিকেলে রাজধানীর কলাবাগানের ২৫ /এ, লেকসার্কাস রোডের বাসায় বসে ভয়াল সে রাতের বর্ণনা করছিলেন শাহানারা আব্দুল্লাহ।

কথার শুরুতেই তিনি বলেন, ‘ওইদিন (১৫ আগস্ট) ফজরের আযানের পর আমরা প্রচণ্ড গুলির শব্দ পাচ্ছিলাম। শব্দ আমাদের বাসার দিকেই আসছিল। আমাদের ঘুম ভেঙে যায়। আমার শ্বাশুড়ি (বঙ্গবন্ধুর বোন আমেনা বেগম) বলেন, ‘বাড়িতে ডাকাত পড়েছে, ডাকাত পড়েছে, আমার ভাইকে ফোন দেও’। আমার শ্বশুর আবদুর রব সেরনিয়াবাত বঙ্গবন্ধুকে একটা ফোনও করেছেন। কিন্তু কী কথা হয়েছে, বলতে পারবো না। এরইমধ্যে আমি মনি (শেখ ফজলুল হক মনি) ভাইকে ফোন করলাম। ফোনে তাকে বললাম, আমাদের বাড়ির দিকে কারা জানি গুলি করতে করতে আসছে, বুঝতে পাচ্ছি না।’

সামনে রাখা গ্লাস থেকে এক ঢোক পানি খেয়ে তিনি আবারো শুরু করলেন বর্ণনা। বললেন, ‘মনি ভাইকে ফোন দিলে তিনি বলেন, কারা গুলি করছে দেখো। বললাম- বৃষ্টির মতো গুলি হচ্ছে, দেখা যাচ্ছে না। মনি ভাই বলেন, তারপরও দেখো, কারা আসছে। এরমধ্যে ফোনটি আমার হাত থেকে টেনে নিয়ে আমার শাশুড়ি মনি ভাইকে বলেন, বাবা বাড়িতে ডাকাত পড়েছে, আমাদের বাঁচাও। এই কথা বলেই ফোন রেখে দিয়ে আমার শাশুড়ি আমার শ্বশুরকে বললেন, কী ব্যাপার তুমি আমার ভাইকে (বঙ্গবন্ধু) ফোন দিলা না? আমার শ্বশুর বলেন, তোমার ভাইও মনে হয় রেহাই পায়নি। ওনার সাথে কী কথা হয়েছে আমরা সেটা শুনি নাই। আমাদের দরজা ভাঙ্গার শব্দ পাচ্ছিলাম। এমন সময় একটা চিৎকার শুনলাম- তোমরা সামনে এগুবে না। ভালো হবে না। এসময় ওরা থমকে দাঁড়ায়। ওই চিৎকারটি দিয়েছিলেন আমার স্বামী (আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ)। এরপর উনি দোতলায় চলে যান। কাজের বুয়া দরজাটা বন্ধ করে দেন। দরজা বন্ধু করে দেয়ার পর উনি আমাদের ঘরে না ঢুকে ডান পাশের রুমে ঢুকে যান। পরে আমরা জানতে পারি, একটা ফোন আসে (ফোনটি রিসিভ করে হাসনাত), মনি ভাই মারা গেছে।’

শাহানারা আব্দুল্লাহ বলতে থাকেন…‘এরমধ্যে ঘাতকরা বাড়ির দরজা ভেঙে ভিতরে ঢোকে । রুমে রুমে ঢুকে হ্যান্ডস আপ হ্যান্ডস আপ বলে হ্যান্ড ক্যাপ পরিয়ে আমাদের সবাইকে কর্ডন করে নিচতলার ড্রইংরুমে সারিবদ্ধ করে দাঁড় করিয়ে রাখে। সিড়ি দিয়ে নিচে নেয়ার সময় আমার ছোট ছেলে সাদিক আব্দুল্লাহ আমার কোলে ছিল। সিড়ির অর্ধেক নেমেই বাবু (সুকান্ত বাবু) বলে, মা আমি তোমার কোলে উঠবো। আমি ওকে কোলে নিতে পারলাম না। পাশে আমার ভাসুর (শহীদ সেরনিয়াবাত) ওকে কোলে নিল। নিচে নামার পর ভারি অস্ত্র ঠেকিয়ে ওরা আমাকে জিজ্ঞাসা করে উপরে আর কে কে আছে? এমন সময় আমার শ্বশুরও এমন ভাবে তাকালেন তার চোখের ইশারায় আমি বললাম, আমিতো বলতে পারি না কে আছে, কে নাই।’

শাহানারা বলেন, ‘তখনও আমরা বুঝতে পারছিলাম না যে এরা আমাদেরকে মারতে আসছে, না অ্যারেস্ট করে নিয়ে যাবে। আমার শ্বশুর ওদেরকে বলে তোমরা কী চাও, তোমাদের কমান্ডিং অফিসার কে? ওদের মধ্যে থেকে একজন বলে, আমরা কিছুই চাই না, আমাদের কোনো কমান্ডিং অফিসার নেই। এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই ব্রাশ ফায়ার করে। ওরা ব্রাশ ফায়ার করলো। আমরা মাটিতে পড়ে যাই।’

এই কথা বলতেই শাহানারা আব্দুল্লাহর চোখ দুটি পানিতে ছলছল করতে থাকে। কণ্ঠ ভারি হয়ে আসে। কিছু সময়ের জন্য চুপ থেকে শাহানারা আব্দুল্লাহ আবার বলতে শুরু করলেন, ‘শহিদ ভাইকে ঠেকিয়ে গুলি করে ওরা। উনি সাথে সাথে উপুর হয়ে পড়েন। আমার শ্বশুরের শরীর দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। আমার শরীরের পিছনেও হাত দিয়ে দেখি রক্ত বের হচ্ছে। ওরা চলে গেল। তখনও আমার জ্ঞান ছিল। এর মধ্যেই কে যেন কান্না করে ওঠে। এরপর ঘাতকরা আবার দৌড়ে এসে ব্রাশ ফায়ার করে। এবার ওরা নিচ দিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে । আমার শ্বশুর সাথে সাথেই মারা যান। আমি আমার শ্বশুরের পিছনে ছিলাম, আমার কোমরে গুলি লাগে। ব্রাশ ফায়ারে সাত জন মারা যায়। আমার শাশুড়িসহ বাকিরা গুলিবিদ্ধ হয়ে কাতরাচ্ছিলেন। এরমধ্যে আবার একদল গাড়ি নিয়ে আসে। তখন ভাবলাম এই বুঝি শেষ। কিন্তু পরে দেখি রমনা থানার পুলিশ এসেছে। তারা আমার শ্বশুরের পালস দেখে। বাড়ির সবাই কেউ আহত, কেউ মারা গেছে।’

এই কথা বলে দীর্ঘক্ষণ চুপ হয়ে গেলেন শাহানারা। দীর্ষ এক শ্বাস ফেলে তিনি বললেন, ‘পুলিশ আসার পর বাবুকে শহীদ ভাইয়ের বুকের নিচ থেকে উঠানো হল, দেখালাম ওর নাক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। কিছু সময়ের আগে যে সন্তান কোলে উঠতে চেয়েছিল, তাকে কোলে নিতে পারি নাই। রক্ত বের হচ্ছে কিন্তু কিছুই করতে পারি নাই।’

এ কথা বলেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন শাহানারা আব্দুল্লাহ। বেশ কিছু সময় চুপ করে থেকে তিনি বললেন, ‘পরে আহত নিহতদেরকে পুলিশ মেডিকেলে নিয়ে যায়।’

ছেলের ছবির অ্যালবামে হাত বুলিয়ে পুরনো স্মৃতি হাতড়াতে গিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠেন মমতাময়ী মা। ছেলের স্মৃতি স্মরণ করে বাবু’র মা বলেন, ‘আমার বাবু ছিল অসম্ভব মা ভক্ত। আমি যখন যা বলতাম তা মেনে নিতো। ও মাঝে মাঝে বলতো মা তোমাকে ছেড়ে অনেক দূরে ঘাসের মধ্যে গিয়ে শুয়ে থাকবো।’

এই কথা বলে কয়েক মিনিট তার কথা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আবার শুরু করলেন শাহানারা আব্দুল্লাহ, ‘ওর জন্ম একাত্তরের ২২ জুন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ওকে বুকে নিয়ে গ্রামে গ্রামে দৌড়াইছি। এক দিকে আর্মি অন্য দিকে রাজাকার। আমার স্বামী বরিশাল অঞ্চলে মুজিব বাহিনীর প্রধান ছিলেন। রাজাকাররা পেলেই আমাকে মেরে ফেলবে। এই আতংকে ছিলাম। যুদ্ধ চলাকালে দীর্ঘদিন হাসনাতের সঙ্গে দেখা হয়নি। পরে একটি চিরকুট পেলাম। তিনি পয়সারহাট এসেছেন। সেখানে গিয়ে দেখা করি। সেই সময়ে বাবুকে বুকে নিয়ে আজকে এই বাড়ি কালকে ওই বাড়িতে দিন পার করেছি। গ্রামে দুধতো দূরের কথা ভাতও ঠিকমতো পাওয়া যায়নি। ভাত টিপে টিপে নরম করে বাবুকে খাইয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘ও রাজত্ব নিয়ে আসছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল ১৯৭১ এ। আবার ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে চলে গেছে ও।’

ছেলের স্মৃতি হাতড়ে মা বলেন, ‘আমার বাবু গুন গুন করে একটা গান গাইতো- আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে…নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কী স্বত্বে ?। আর ঘুমাতে যাওয়ার সময় ওর প্রিয় একটি গান না গাইলে বাবু ঘুমাতো না।’

কী গান জানতে চাইলে ধরা গলায় মা গেয়ে ওঠেন, ‘আমি সাত সাগর পাড়ি দিয়ে কেন সৈকতে পড়ে আছি/ কোন অশ্রু ভেজা স্বপনে মনে তাজমহল গড়েছি… আজ নেই যে আগের সেই দৃষ্টি/ এলো দুচোখে ব্যাথার ঝড় বৃষ্টি/ জীবনের চাওয়াটাকে মুছে ফেলে/ শূন্যটাকে আমি ধরেছি, সৈকতে পড়ে আছি।’


ফেসবুকে মন্তব্য করুন :

টি মন্তব্য
মন্তব্যে প্রকাশিত যেকোন কথা মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। Gournadi.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের কোন মিল নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে Gournadi.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নিবে না

Tags

আরো পোষ্ট...

Leave a Reply